ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধের দাবি জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ২৬ বার
ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধের দাবি জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজায় চলমান সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের জাতীয় ফুটবল দলকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। সোমবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) এবং ইউরোপীয় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা (UEFA)-র প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান গণহত্যার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাধুলার আসরকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ছায়া থেকে মুক্ত রাখা শুধু নৈতিক দায়িত্বই নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইনেও বাধ্যবাধকতা।

জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ড গণহত্যার শামিল এবং এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছিল, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রের ওপর গণহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়। এই আইনি কাঠামোর দিকেই ইঙ্গিত করে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা ফিফা ও উয়েফার প্রতি আহ্বান জানান যে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্ল্যাটফর্ম কোনোভাবেই মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের স্বাভাবিকীকরণে ব্যবহার করা উচিত নয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ক্রীড়াজগতকে অবশ্যই এই বার্তাটি পরিষ্কারভাবে দিতে হবে যে, মানবাধিকার উপেক্ষা করে কোনো প্রতিযোগিতা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। খেলাধুলা কেবল বিনোদন কিংবা প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক প্ল্যাটফর্ম, যা মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করতে পারে। তারা জোর দিয়ে বলেন, ক্রীড়া সংস্থাগুলোর উচিত নয় এমন পরিস্থিতিতে নির্লিপ্ত থাকা, যেখানে নিরীহ মানুষ গণহত্যার শিকার হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা তাদের আহ্বানে স্পষ্ট করেছেন যে, এই নিষেধাজ্ঞা ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতি নির্দেশিত, ব্যক্তিগত খেলোয়াড়দের প্রতি নয়। তারা ব্যাখ্যা করেন, কোনো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের জন্য খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা উচিত নয়। বরং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে যে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

ফিফা ও উয়েফার কাছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আরও দাবি করেন যে, তারা যেন ইসরাইলের অবৈধ উপস্থিতিকে বৈধতা দেওয়া বন্ধ করে এবং গণহত্যা প্রতিরোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়। তাদের মতে, খেলাধুলার জগতে এমন রাষ্ট্রকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া মানে হলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শিকার মানুষদের দুর্দশাকে বৈধতা দেওয়া।

এই আহ্বানের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গন থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে ফুটবলকে ঘিরে এই দাবি আরও জোরালো হয়েছে, কারণ ফুটবল বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা এবং এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিশাল। অন্যদিকে, ইসরাইলের সমর্থকরা মনে করেন, খেলাধুলাকে রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত এবং এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা ক্রীড়ার মূল স্পিরিটের পরিপন্থী হবে।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে রাষ্ট্রভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার নজির নতুন নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা যখন বর্ণবাদী নীতিতে পরিচালিত হচ্ছিল, তখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গন থেকে দেশটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। একইভাবে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ফিফা ও উয়েফা রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করে। জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নজিরগুলো প্রমাণ করে যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে খেলাধুলার জগৎও কঠোর অবস্থান নিতে পারে এবং নেওয়া উচিত।

বর্তমানে গাজার পরিস্থিতি দিন দিন আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবিরসহ বহু বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ফিফা ও উয়েফার মতো প্রভাবশালী সংস্থার নীরবতা মানবাধিকারকর্মীদের মতে অগ্রহণযোগ্য। তাদের ধারণা, ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে শুধু রাজনৈতিক বার্তাই যাবে না, বরং তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি নৈতিক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।

অন্যদিকে, ফিফা ও উয়েফা এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে বলে জানা গেছে। কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াজগতে বিভাজন তৈরি হতে পারে। আবার অনেকে মনে করেন, মানবাধিকার ইস্যুতে ফিফা বা উয়েফা নিরপেক্ষ থাকতে পারে না।

সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে এসেছে ১৯০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স

এই বিতর্কের মধ্যেই ফুটবল বিশ্বে চাপ বাড়ছে। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের ক্রীড়া সংগঠন জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের আহ্বানকে সমর্থন করেছে। তারা মনে করছে, খেলাধুলাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা সময়ের দাবি। এদিকে, ফিলিস্তিনের ক্রীড়া সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলের সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে, তবে ফিফা এতদিন সেই দাবি কার্যকর করেনি।

সব মিলিয়ে ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে নতুন এক চাপ সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার প্রশ্নে ফিফা ও উয়েফার অবস্থান কী হবে, তা এখন বিশ্বজুড়ে নজরে রয়েছে। ক্রীড়া জগত শুধু প্রতিযোগিতা বা বিনোদনের জায়গা নয়, বরং এটি মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবেও কাজ করতে পারে—এবারের বিতর্কে সেই দায়িত্বই আবার সামনে চলে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত