প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতা সম্প্রসারণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়া প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি (ডিটিএ) করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে মতৈক্য গৃহীত হয়েছে, এবং চলতি বছরের অক্টোবর অথবা নভেম্বর মাসে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর সংক্রান্ত জটিলতা কমবে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও সুবিধাজনক হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আন্তর্জাতিক কর বিষয়ক সদস্য মো. লুৎফুল আজীম বলেন, “আমরা কেনিয়ার সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি সম্পূর্ণরূপে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছি। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষার্ধে এটি স্বাক্ষরিত হতে পারে। চুক্তি কোথায় স্বাক্ষরিত হবে—ঢাকায় নাকি নাইরোবিতে—তার বিস্তারিত নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।”
দুই দেশের মধ্যকার এই চুক্তির উদ্যোগ ২০২২ সালে শুরু হয়। এরপর মোট তিন দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে স্কয়ারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই কেনিয়ায় বিনিয়োগ করছে। এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, চুক্তি কার্যকর হলে এই বিনিয়োগকারীরা দুই দেশে একই আয়ের ওপর কর প্রদানের জটিলতা এড়াতে পারবেন।
দ্বৈত করের অর্থ হলো একই আয়ের ওপর একাধিক দেশের দ্বারা কর আরোপ। উদাহরণ হিসেবে, একজন বাংলাদেশি নাগরিক যদি যুক্তরাজ্য বা অন্য কোনো দেশের কাছ থেকে আয় করেন, তবে সেই আয়ের ওপর বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারও কর দাবি করতে পারে। দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির মাধ্যমে এ ধরনের দ্বৈত করের বোঝা কমানো যায়। চুক্তির আওতায় করদাতা হয় সম্পূর্ণ করমুক্তি পান, অথবা কর রেয়াত পদ্ধতিতে একটি দেশে কর পরিশোধ করা হলে অন্য দেশে তা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বের ৪১টি দেশের সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি করেছে। তবে এ সংখ্যা অঞ্চলভিত্তিক তুলনায় কম। বর্তমান সরকার এ সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। বর্তমানে অস্ট্রিয়া এবং আজারবাইজানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, ইতিমধ্যেই দুই দেশের মধ্যে দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়াও উজবেকিস্তান এবং হাঙ্গেরির সঙ্গে এ ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে।
লুৎফুল আজীম বলেন, “যে কোনো ব্যবসা বা বিনিয়োগে কর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণত যেসব দেশে করহার কম, বিনিয়োগকারীরা সেখানে বেশি আগ্রহী হন। কিন্তু করহার বেশি হলে বিনিয়োগকারীরা সংশয় প্রকাশ করেন। দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি না থাকলে একজন বিনিয়োগকারীকে একই আয়ের ওপর দুইবার কর দিতে হবে, যা অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করে। চুক্তি থাকলে আয়কর নির্ধারণ একটি সুষম ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়, যা বিনিয়োগকারীর জন্য সুবিধাজনক।”
দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি কেবল বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ায় না, বরং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কেনিয়ার বাজারে বিনিয়োগকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। এছাড়াও এই সুবিধার আওতায় সাধারণ নাগরিকরাও উপকৃত হন, কারণ তারা বিদেশ থেকে আয় করলে দ্বৈত করের বোঝা এড়াতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের চুক্তি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিবেশে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। বিনিয়োগকারীরা নির্ধারিত কর কাঠামোর কারণে ঝুঁকিহীন ও স্থিতিশীল বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। ফলস্বরূপ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পরবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডিটিএ চুক্তি কেবল কর সংক্রান্ত সুবিধা দেয় না, বরং এটি দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত করবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো আফ্রিকার বাজারে প্রবেশ সহজতর হবে এবং স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
এনবিআরের পদক্ষেপ অনুসারে, চুক্তি কার্যকর হলে দুই দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারীরা করসংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে পারবেন এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ও স্থিতিশীল কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে সক্ষম হবেন। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীর আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ-কেরিয়ার দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ, করজট কমানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে সম্ভাব্য স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে এ চুক্তি বাংলাদেশ ও কেনিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।