ট্রাম্পের শুল্কে ভারতীয় ওষুধে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৪ বার
👉 শর্ট টাইটেল: ট্রাম্পের শুল্কে ভারতীয় ওষুধে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণায় ভারতীয় ওষুধ শিল্পের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে ব্র্যান্ডেড এবং পেটেন্ট করা ওষুধ আমদানির ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নির্ভরশীল ভারতীয় ওষুধ খাতকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ পোস্ট করে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যে কোনো কোম্পানি যদি যুক্তরাষ্ট্রে নিজস্ব কারখানা নির্মাণ শুরু না করে, তবে তাদের ব্র্যান্ডেড বা পেটেন্ট ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে শতভাগ শুল্ক গুনতে হবে। তবে যে প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই শুল্ক কার্যকর হবে না।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জেনেরিক ওষুধ উৎপাদক দেশ। যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতের মোট ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২৭.৯ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৮.৭ বিলিয়ন ডলার— অর্থাৎ মোট রপ্তানির প্রায় ৩১ শতাংশ— গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। শুধু ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক নীতি ভারতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকে অর্থনৈতিকভাবে নড়বড়ে করে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে এসেছে ১৯০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতীয় ওষুধের অবদানও অনস্বীকার্য। বর্তমানে সেখানে ব্যবহৃত সাশ্রয়ী জেনেরিক ওষুধের প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে ভারত থেকে। একইসঙ্গে ১৫ শতাংশ বায়োসিমিলার ওষুধও ভারতীয় কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে। ফলে ড. রেড্ডি’স, অরবিন্দো ফার্মা, জাইডাস, সান ফার্মা ও গ্ল্যান্ড ফার্মার মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের একটি বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর। তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ আসে এই বাজার থেকে। সেক্ষেত্রে শুল্ক দ্বিগুণ হয়ে গেলে শুধু কোম্পানিগুলোর লাভের মার্জিন কমে যাবে না, বরং পুরো বাজারের কাঠামোতেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।

যদিও ট্রাম্পের নতুন শুল্ক মূলত ব্র্যান্ডেড ও পেটেন্ট ওষুধকে লক্ষ্য করে, কিন্তু এ নীতির আওতায় জটিল জেনেরিক ও বিশেষায়িত ওষুধও চলে আসতে পারে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম দামে ওষুধ সরবরাহ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি শুল্কের কারণে খরচ বেড়ে যায়, তবে তা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা বা বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। এর ফলে আমেরিকায় ওষুধের দাম বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল, এমনকি কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।

ভারতীয় ওষুধ শিল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার শুধু বাণিজ্যের ক্ষেত্র নয়, বরং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতারও কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) থেকে অনুমোদন পাওয়া মানেই বৈশ্বিক বাজারে প্রতিষ্ঠানের মান ও সুনাম বৃদ্ধি। কিন্তু শুল্কনীতির এই নতুন ধাক্কা এফডিএ অনুমোদিত বহু ভারতীয় ওষুধকেই প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দিতে পারে, যার ফলে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার মতো অঞ্চলেও ভারতের প্রভাব কমতে পারে।

ওষুধের দামের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সবসময়ই একটি বড় ইস্যু। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত মূলত অভ্যন্তরীণ শিল্প সুরক্ষার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিনিয়োগ বাড়ে এবং দেশীয় উৎপাদন জোরদার হয়। তবে এর ফলাফল কতটা ইতিবাচক হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত ওষুধের খরচ ভারত বা চীনের তুলনায় বহুগুণ বেশি, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ভারতের নীতিনির্ধারকরা এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওষুধ রপ্তানি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে বলে জানা গেছে। সম্ভাব্য বিকল্প বাজার অনুসন্ধান, নতুন বাণিজ্যিক চুক্তি এবং অভ্যন্তরীণ ভর্তুকি প্রদানের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সমান বিকল্প তৈরি করা ভারতের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জটিল হয়ে উঠেছে। এর আগেও ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন। পাশাপাশি রাশিয়ার তেল আমদানি অব্যাহত রাখার কারণে ২৫ শতাংশ বাড়তি জরিমানাও যুক্ত হয়েছিল। ফলে শুল্কনীতির ধারাবাহিক চাপ ভারতের বিভিন্ন খাতে প্রতিকূল প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বব্যাপী ওষুধ সরবরাহ শৃঙ্খলও এই নতুন নীতির কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় ওষুধের ঘাটতি তৈরি হলে অন্যান্য দেশ থেকেও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় বৈশ্বিক ওষুধবাজারে অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে প্রাণরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে এ ধরনের জটিলতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ঘোষিত শতভাগ শুল্ক শুধু ভারতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকেই নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা খাতকেও নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখনো পরিষ্কার নয়, এই সিদ্ধান্তে ভারত কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে বা দুই দেশের মধ্যে নতুন কোনো আলোচনার সম্ভাবনা আছে কি না। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—এই শুল্ক নীতি কার্যকর হলে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জটিল হবে এবং সাধারণ জনগণকেও তার প্রভাব অনুভব করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত