প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পরপরই শহরের ম্যানহাটন এলাকায় তার অবস্থানকৃত হোটেলের সামনে বিক্ষোভের ঝড় ওঠে। ইসরাইলবিরোধী বিভিন্ন সংগঠন ও প্রবাসী ইহুদিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা নেতানিয়াহুর যুদ্ধনীতির তীব্র সমালোচনা করেন এবং গাজায় চলমান হামলা বন্ধের পাশাপাশি বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন। নিউইয়র্কের ব্যস্ততম এ অঞ্চলে দিনভর চলা বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল নানা ধরনের ব্যানার-প্ল্যাকার্ড, যেখানে লেখা ছিল—“ইসরাইলকে নেতানিয়াহুর হাত থেকে বাঁচাও”, “যুদ্ধ বন্ধ করো” এবং “সকলকে মুক্ত করো”। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান তুলছিলেন গাজা যুদ্ধের অবসান ও জিম্মিদের মুক্তির দাবিতে। তাদের দাবি, নেতানিয়াহু সরকার কেবল নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার জন্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে এবং মানবিক দিককে অবহেলা করছে।
এটি প্রথমবার নয় যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ইসরাইলিরা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ করেছেন। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে নেতানিয়াহু সরকারের বিচার বিভাগ সংস্কার পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী ইসরাইলি এবং অনেক মার্কিন ইহুদিরা প্রকাশ্যে আন্দোলনে নামেন। এটি দীর্ঘদিনের এক প্রথা ভেঙে দিয়েছিল, কারণ এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিরা খুব কম ক্ষেত্রেই প্রকাশ্যে ইসরাইল সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিতেন। ২০২৩ সালের সেই আন্দোলন নিউইয়র্কে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তবে গাজা যুদ্ধ ও এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিবিদ্বেষ বাড়তে শুরু করলে আন্দোলনের মাত্রা কিছুটা কমে আসে। তবুও আন্দোলনের ভেতরে বিভক্তি তৈরি হয়েছে—একটি অংশ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে কেবল বন্দিদের মুক্তির দাবিতে কাজ করছে, অন্য অংশ রাজনৈতিক বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে।
শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নির্ধারিত রয়েছে। তার আগে ও চলাকালীন সময়ে নিউইয়র্কে আরও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ইসরাইলি প্রবাসীদের সংগঠন “আনএকসেপ্টেবল”। সংগঠনটি জানিয়েছে, ভোরে তারা ফক্স নিউজের স্টুডিওর সামনেও অবস্থান নেবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি তাদের দাবির বিষয়ে অবহিত হন। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অফির গুটেলজোন গণমাধ্যমে বলেন, “ইহুদিবাদের সবচেয়ে মৌলিক নীতি হলো জীবন রক্ষা করা। অথচ নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক টিকে থাকার স্বার্থে বন্দিদের মুক্তি নিশ্চিত করছেন না। আমরা দেখাতে চাই যে ইসরাইলিরা জীবন, শান্তি ও গণতন্ত্র চায়, নিরন্তর যুদ্ধ নয়।”
শুক্রবার সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় গাজায় হামাসের হাতে বন্দিদের পরিবারের সদস্যরাও বিক্ষোভে যোগ দেবেন। তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্বনেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি ছাড়া বন্দিদের মুক্তির অন্য কোনো কার্যকর উপায় নেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও তাদের দাবি সমর্থন করছে এবং বলছে, এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
অন্যদিকে, অ-ইহুদি ইসরাইলবিরোধী গোষ্ঠীগুলোও নেতানিয়াহুর সফরের সময় বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তারা শুক্রবার সকালে জাতিসংঘের বাইরে একটি বড় সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলোর মূল দাবি হলো গাজায় ইসরাইলি হামলা বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহলের স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ। তারা মনে করে, নেতানিয়াহু সরকারের নীতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে এবং বৈশ্বিক মানবাধিকারের মৌলিক নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
নিউইয়র্কের এই বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা দিয়েছে। একদিকে, প্রবাসী ইসরাইলিরা সরকারের নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছেন; অন্যদিকে, মার্কিন মুলুকে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীও এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। এতে প্রমাণিত হচ্ছে, ইসরাইলের ভেতরে ও বাইরে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা আগের মতো নেই এবং তার নীতির বিরোধিতা আন্তর্জাতিকভাবে বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিক্ষোভ কেবল একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ ইতিমধ্যেই হাজারো প্রাণহানি ঘটিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘ বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও তা কার্যকর হয়নি। বরং প্রতিনিয়ত যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে, আর এর বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই পরিস্থিতিতে প্রবাসী ইসরাইলিরা মনে করছেন, তাদের কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শোনা গেলে হয়তো সরকার বন্দিদের মুক্তি ও যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে চাপ অনুভব করবে।
শুক্রবারের বিক্ষোভে নজর থাকবে বিশ্ব গণমাধ্যমের ওপরও। নেতানিয়াহুর ভাষণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বিক্ষোভকারীদের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করবে বলে জানা গেছে। ফলে এই প্রতিবাদ আন্তর্জাতিক মহলে আরও বড় প্রতিধ্বনি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, নিউইয়র্কে নেতানিয়াহুর সফরকে ঘিরে যে বিক্ষোভের ঢেউ তৈরি হয়েছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে ইসরাইল সরকারের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও জটিল হতে চলেছে। নেতানিয়াহু শুক্রবার জাতিসংঘে কী বলেন এবং বিক্ষোভকারীরা কতটা প্রভাব ফেলতে সক্ষম হন—এখন সেটিই দেখার বিষয়।