ট্রাম্পের ঘোষণা: বিদেশি চলচ্চিত্রে শতভাগ শুল্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১৯ বার
গাজায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান, শান্তির ঘোষণা ট্রাম্পের

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন তার বহুল আলোচিত নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে। সোমবার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নির্মিত সকল চলচ্চিত্রের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার সময়সীমা তিনি স্পষ্ট না করলেও এমন ঘোষণায় বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্পে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

ট্রাম্প তার ঘোষণায় বলেন, মার্কিন চলচ্চিত্র শিল্প দীর্ঘদিন ধরে অন্য দেশগুলোর কাছে সুযোগ হারাচ্ছে। তার ভাষায়, “আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে চুরি করে নেওয়া হয়েছে। এটা ঠিক শিশুর হাত থেকে চকলেট কেড়ে নেওয়ার মতো।” তিনি দাবি করেন, নতুন করে আরোপিত এই শুল্কের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী এক সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। এ ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, বিদেশি প্রযোজনা ও শুটিং লোকেশনের ওপর নির্ভরশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ঘোষণা ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গত মে মাসে তিনি প্রথমবারের মতো বিদেশি চলচ্চিত্রের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, মার্কিন চলচ্চিত্র শিল্প দ্রুত পতনের দিকে যাচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তার পরপরই গত সপ্তাহে তিনি নতুন ব্র্যান্ডেড বা পেটেন্ট করা ওষুধ আমদানির ওপর ১০০ শতাংশ এবং রান্নাঘর ও বাথরুম ক্যাবিনেটের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। ফলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্প তার অর্থনৈতিক নীতি আরও সুরক্ষামূলক (protectionist) করার পথে এগোচ্ছেন।

মার্কিন চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাস ও পরিধি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছে। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ার হলিউড বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক চলচ্চিত্র প্রযোজনার ধারা উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় বাজেটের ছবিই বর্তমানে শুটিং করা হয় বিদেশে। এর পেছনে রয়েছে নানা কারণ—কর সুবিধা, সস্তা লোকেশন খরচ, এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সহজলভ্যতা।

উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক মুক্তিপ্রাপ্ত বা মুক্তির অপেক্ষায় থাকা বেশ কয়েকটি আলোচিত ছবির নাম উল্লেখ করা যায়। জনপ্রিয় মার্ভেল সিনেমা ইউনিভার্সের ডেডপুল অ্যান্ড উলভারিন, ব্রডওয়ে মিউজিক্যাল থেকে নির্মিত উইকেড, এবং রিডলি স্কটের গ্লাডিয়েটর ২—এই তিনটি বহুল আলোচিত চলচ্চিত্রের শুটিং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগকৃত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে গেছে কানাডা, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে।

চলচ্চিত্র বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রোডপ্রো-র সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদিও এই পরিমাণ ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম। বিপরীতে একই সময়ে কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে প্রযোজনায় খরচের হার বেড়েছে। এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে চলচ্চিত্র শিল্পের টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্ব বিনোদন শিল্পের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। শুধু সিনেমা নয়, ওয়েব সিরিজ, ডকুমেন্টারি, এবং অন্যান্য কনটেন্ট নির্মাণেও দেশটি নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। অনেক সমালোচক বলছেন, বিশ্বব্যাপী বিনোদন বাজারের প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে, শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব নাও হতে পারে। বরং এটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পরিবেশনায় জটিলতা তৈরি করতে পারে।

শিল্প সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রভাবকে আরও সংকীর্ণ করতে পারে। কারণ, চলচ্চিত্র শিল্প আজ আর কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও সংস্কৃতির বিনিময় ক্ষেত্র। অনেক বহুজাতিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে বিভিন্ন দেশে শুটিং ও প্রযোজনার কাজ করে থাকে। ফলে এ ধরনের শুল্ক আরোপ বিদেশি প্রযোজনা কোম্পানির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে দুর্বল করতে পারে।

অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থকেরা মনে করছেন, বিদেশি চলচ্চিত্রের ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান বাড়বে। কারণ, যদি বিদেশে শুটিং খরচ বেড়ে যায় তবে প্রযোজকরা বাধ্য হবেন দেশীয় লোকেশনে কাজ করতে। এতে কেবল চলচ্চিত্র শিল্পই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল, পরিবহন, ট্যুরিজমসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতও লাভবান হবে।

কিন্তু সমালোচকরা পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন যে, চলচ্চিত্র শিল্পে প্রতিযোগিতা সৃজনশীলতার ওপর নির্ভরশীল, কেবল অর্থনৈতিক শর্তে নয়। অনেক পরিচালক বা প্রযোজক বিদেশি লোকেশনে শুটিং করতে চান শিল্পকর্মের প্রয়োজনের কারণে, শুধু খরচের জন্য নয়। তাই শুল্ক আরোপ শিল্পের স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্য সীমিত করে দিতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের এই নীতি কেবল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও ফেলতে পারে। তার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্সি থেকেই তিনি সুরক্ষাবাদী অর্থনীতির প্রবল সমর্থক। বিদেশি পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে তিনি বারবার স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এবার সেই লক্ষ্যেই চলচ্চিত্র শিল্পকে সামনে এনে এক নতুন বিতর্ক উসকে দিলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্প এখন এক অস্থির সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও সৃজনশীলতার প্রসার, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী অর্থনৈতিক নীতির বেড়া—এই টানাপোড়েনের ভেতরেই আগামী দিনের সিনেমা গড়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত