গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত আরও ৫৩: বাড়ছে প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩১ বার
গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত আরও ৫৩: বাড়ছে প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ‘২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অব্যাহত হামলায় একদিনে আরও ৫৩ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই হামলায় নিহতের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, ইসরাইলি সেনারা গাজা সিটির অবশিষ্ট বাসিন্দাদের জন্য নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বলা হয়েছে, যারা গাজা সিটিতে থেকে যাবেন, তাদের সবাইকে “সন্ত্রাসী” অথবা “সন্ত্রাসীদের সমর্থক” হিসেবে গণ্য করা হবে। এই ঘোষণার ফলে পুরো উপত্যকাজুড়ে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “গাজা সিটিতে অবস্থানরত সকলকে আমরা সন্ত্রাসী অথবা সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করব।” এই বার্তা প্রকাশিত হওয়ার পরই গাজা সিটির চারদিকে নতুন করে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে দক্ষিণ দিকে পালানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু পালানোর পথও আর নিরাপদ নয়। কারণ উপকূলীয় রাস্তাগুলোতে ট্যাংক, ড্রোন এবং যুদ্ধবিমান দিয়ে নতুন করে আক্রমণ চালানো হচ্ছে।

গাজায় ইসরাইলি হামলা নতুন কিছু নয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই আগ্রাসন ইতোমধ্যেই হাজারো প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ২২৫ জনে, আর আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৩৮ জন। এ বছরের মার্চ মাসে ইসরাইল একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করার পর থেকে প্রাণহানি আরও বেড়ে গেছে, যেখানে শুধু গত কয়েক মাসেই ১৩ হাজার ৩৫৭ জন নিহত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবারের হামলায় গাজা সিটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ নিহত হচ্ছে, ধসে পড়ছে আবাসিক ভবন, হাসপাতাল ও স্কুল। যারা জীবিত আছেন, তারা পালানোর পথ খুঁজছেন, কিন্তু দক্ষিণমুখী হওয়ার চেষ্টায়ও হামলার মুখে পড়ছেন। আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ জানিয়েছেন, আল-রাশিদ সড়ক হয়ে দক্ষিণ দিকে যাওয়া মানুষদের ওপর হেলিকপ্টার ও ড্রোন থেকে হামলা চালানো হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, “মানুষ গাজা সিটি ছাড়ছে না মূলত ভয়, আতঙ্ক এবং ইসরাইলি সেনাদের ভয়ঙ্কর তৎপরতার কারণে।”

চিকিৎসা সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার গাজা সিটির ভেতরে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ গাজায় খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরাইলি বাহিনীর আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১৩ জন। ইতোমধ্যেই খাদ্য সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছে, গাজার মানুষ এখন দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি। খাদ্য সংগ্রহের জন্য যারা বাইরে বের হচ্ছেন, তাদের অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারছেন না। এ পর্যন্ত খাদ্য ও ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৯ হাজার।

মানবিক এই বিপর্যয় আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব একাধিকবার গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন, তবে ইসরাইল এখন পর্যন্ত তাদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, গাজায় যা ঘটছে তা কার্যত গণহত্যার শামিল। একদিকে চলছে বেসামরিক মানুষদের ওপর নির্যাতন, অন্যদিকে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে দেওয়া হচ্ছে না।

গাজা সিটির বর্তমান চিত্র যেন এক গভীর ট্র্যাজেডির প্রতিচ্ছবি। পুরো নগরী এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাজারো মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে রাস্তায় অবস্থান করছেন। শিশু ও নারীরাই সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন। হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। আহতদের সেবা দেওয়ার মতো কোনো পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। চিকিৎসকরা দিন-রাত এক করে কাজ করছেন, কিন্তু প্রতিদিন এত বিপুল সংখ্যক আহতকে সেবা দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, ইসরাইলি হামলার কারণে গাজার অর্ধেকেরও বেশি জনগণ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দক্ষিণ দিকে পালিয়ে যাওয়া মানুষের জন্য আশ্রয়স্থলও এখন পর্যাপ্ত নয়। অনেকে স্কুল বা খোলা জায়গায় দিন কাটাচ্ছেন, কিন্তু সেই স্থানগুলোও নিরাপদ নয়। প্রায়ই সেসব স্থানে আঘাত হানছে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র।

ফিলিস্তিনিদের প্রতি আন্তর্জাতিক সহানুভূতি থাকলেও বড় শক্তিগুলোর ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে দ্বিমুখী অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু পশ্চিমা দেশ ইসরাইলকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে সমর্থন দিচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক সাহায্যের আহ্বান জানাচ্ছে। এই দ্বন্দ্বের কারণে কার্যকর সমাধান আসছে না।

গাজায় চলমান এই হামলা শুধু প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞই নয়, বরং ফিলিস্তিনি জনগণের ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, স্বাস্থ্যখাত প্রায় অকার্যকর হয়ে গেছে। শিশুদের বড় হওয়ার সুযোগ নেই, আর প্রাপ্তবয়স্কদের জীবিকা নির্বাহের কোনো পথ নেই। এক কথায় বলা যায়, গাজা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবিক কারাগারে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলের এই ধরনের অভিযান মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নিজেদের নিরাপত্তার কথা বলে তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর দমননীতি চালাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশল কার্যকর হবে না। বরং এটি আরও বিদ্বেষ, সংঘাত এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক মহল যদি এখনই শক্ত পদক্ষেপ না নেয়, তবে গাজার সংকট এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেবে, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে, গাজায় ইসরাইলি হামলায় প্রতিদিন যে প্রাণহানি ঘটছে, তা শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং একেকটি পরিবার, একেকটি জীবন, একেকটি গল্প। এই হত্যাযজ্ঞ থামানো এখনই জরুরি, নাহলে ইতিহাসের এক ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে সমগ্র বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত