ফ্রিডম ফ্লোটিলার সব নৌযান একসঙ্গে গাজার পথে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৫ বার
বাংলাদেশে ফিরলেন শহিদুল আলম

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজার অবরুদ্ধ উপকূলে পৌঁছাতে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক নৌযাত্রা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইসরায়েলি সেনাদের দ্বারা প্রথম বহর আটক হওয়ার পরও থামেনি এই উদ্যোগ। বরং আরও শক্তভাবে গাজার পথে এগোচ্ছে দ্বিতীয় বহর ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’। এতে যুক্ত হয়েছে ১০টি নৌযান, যেগুলো এখন একসঙ্গে যাত্রা করছে গাজার দিকে। এ যাত্রার কেন্দ্রে আছে ‘কনসায়েন্স’ নামের দ্রুতগামী জাহাজ, যেটি বহরের সবার শেষে যাত্রা শুরু করেও এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে পুরো অভিযাত্রাকে।

কনসায়েন্সে রয়েছেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম। দৃক গ্যালারির এই প্রতিষ্ঠাতা দীর্ঘদিন ধরেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। তিনি কনসায়েন্স থেকে জানাচ্ছেন, এই নৌযাত্রা কেবল কিছু জাহাজের যাত্রা নয়, বরং এটি জনগণের শক্তি ও দৃঢ় সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ। তার ভাষায়, “এটি এক মানবস্রোত, যা ইসরায়েলের পক্ষে থামানো সম্ভব নয়।”

ফ্রিডম ফ্লোটিলা আসলে একটি বৈশ্বিক আন্দোলনের নাম। এর আয়োজক জোট ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি) এবং সহযাত্রী সংগঠন থাউজেন্ড ম্যাডলিনস টু গাজা (টিএমটিজি) বহু বছর ধরে গাজার অবরোধ ভাঙতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য হলো মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গাজার মানবিক সংকটকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা। এবারও সেই একই লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ইতালির ওত্রান্তো থেকে কনসায়েন্সের যাত্রা শুরু হয়। এরই মধ্যে ২ অক্টোবর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ফ্লোটিলার কয়েকটি জাহাজ আটক করেছে, কয়েকশ অধিকারকর্মীকে আটক করে নিয়ে গেছে। কিন্তু কনসায়েন্স শেষ মুহূর্তে যাত্রা শুরু করায় আটকের হাত থেকে বেঁচে যায় এবং পরে আরও নয়টি নৌযানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গাজা অভিমুখী বহরকে পূর্ণতা দেয়।

শহিদুল আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, গণহত্যা প্রতিরোধে যখন বিশ্বনেতারা নীরব, তখন সাধারণ মানুষই দায়িত্ব নিচ্ছে। তার মতে, এই অভিযাত্রা প্রমাণ করছে, জনগণ চাইলে কোনো স্বৈরশাসকই জনগণের শক্তির বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারে না। ইসরায়েলের পরিকল্পনা যাই হোক, মানবিকতার শক্তির কাছে তা ব্যর্থ হবে। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, “ফিলিস্তিন মুক্ত হবেই।”

ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের ওয়েবসাইট জানিয়েছে, কনসায়েন্সে রয়েছেন অন্তত ২৫ দেশের সাংবাদিক ও স্বাস্থ্যকর্মী। তারা গাজায় অবরুদ্ধ মানুষের জন্য কণ্ঠস্বর তুলতে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে এই বিপজ্জনক যাত্রায় শরিক হয়েছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি, যারা এই অভিযাত্রাকে বৈশ্বিক সংহতির এক প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও এই ঐতিহাসিক অভিযাত্রা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস শনিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, শহিদুল আলমের পদক্ষেপ শুধু একটি মানবিক উদ্যোগ নয়, বরং বাংলাদেশের সাহস ও মানবতার প্রতীক। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৮ সালে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে শহিদুল আলমকে দীর্ঘ ১০৭ দিন কারাবন্দী থাকতে হয়েছিল। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি, বরং আরও দৃঢ় হয়ে ফিরে এসেছিলেন। আজ সেই একই সাহসিকতা নিয়ে তিনি গাজার অবরুদ্ধ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

ড. ইউনূস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া নিজের পূর্ববর্তী বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, অন্যের দুর্ভোগ ও পীড়নের প্রতি বিশ্বনেতাদের ঔদাসীন্য বহু দশকের উন্নয়নকে ধ্বংস করছে। তার মতে, এর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ হলো গাজা, যেখানে শিশুরা অনাহারে মারা যাচ্ছে, হাসপাতাল ও স্কুল ধ্বংস করা হচ্ছে এবং এক গোটা জনগোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন, “আমরা শহিদুল আলমের পাশে আছি, গাজার পাশে আছি— এখন এবং চিরকাল।”

শহিদুল আলমের উদ্যোগকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, এই উদ্যোগ কেবল সংহতির প্রতীক নয়, বরং এটি বিবেকের গর্জন। তার মতে, বাংলাদেশের পতাকা বহন করে শহিদুল আলম বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশ কখনও অবিচার ও নিপীড়নের কাছে মাথা নত করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। বিএনপি নেতা আরও আশ্বস্ত করেন, তাদের দল সর্বদা শহিদুল আলম এবং ফিলিস্তিনের জনগণের পাশে থাকবে।

ইতিহাসে এর আগেও একাধিকবার গাজার অবরোধ ভাঙতে চেষ্টা করেছে ফ্লোটিলা আন্দোলন। তবে প্রতিবারই ইসরায়েলি বাহিনী সেসব উদ্যোগ দমন করেছে। ২০১০ সালে ‘মাভি মারমারা’ নামে একটি তুর্কি জাহাজে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নয়জন মানবাধিকারকর্মী নিহত হয়েছিলেন। সেই থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা আরও বৃদ্ধি পায়। এবারের উদ্যোগও সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ। তবে এবার বৈশ্বিকভাবে আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন দেশের সক্রিয় উপস্থিতি এটিকে অন্যরকম শক্তি দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্রিডম ফ্লোটিলার এই যাত্রা কেবল মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর প্রচেষ্টা নয়, বরং এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। যখন বিশ্বশক্তিগুলো নীরব অথবা দ্বিধাগ্রস্ত, তখন সাধারণ মানুষই এগিয়ে আসছে। এর মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হচ্ছে, মানবিক সংকটে নীরব থাকা মানেই অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।

বর্তমানে গাজার অবরোধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত মানবিক সংকটগুলোর একটি। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বারবার বলছে, ইসরায়েলের অবরোধ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। তবুও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ফ্রিডম ফ্লোটিলা আন্দোলন বিশ্ববাসীকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, মানবিকতার প্রশ্নে নীরব থাকা কোনো সমাধান নয়।

শহিদুল আলম ও তার সহযাত্রীদের এই অভিযাত্রা অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক। যে কোনো মুহূর্তে তারা ইসরায়েলি সেনাদের মুখোমুখি হতে পারেন। কিন্তু তারপরও তাদের চোখে ভয় নেই, আছে দৃঢ় প্রত্যয়। তাদের মতে, যদি এই বহর থেমেও যায়, তবে আরও বহর আসবে, আরও মানুষ এগিয়ে আসবে। মানবিকতার এই স্রোত কোনো শক্তিই থামাতে পারবে না।

গাজার পথে এই যাত্রা তাই কেবল একটি নৌযাত্রা নয়, বরং মানবতার ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়। বিশ্ববাসী শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছে, এই বহর কতদূর যেতে পারে, এবং গাজার নিষ্পেষিত মানুষদের কাছে পৌঁছাতে পারে কি না। কিন্তু ফল যাই হোক না কেন, ফ্রিডম ফ্লোটিলা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে, মানবতার প্রশ্নে মানুষ এখনও জেগে উঠতে পারে, একত্রিত হতে পারে এবং অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে।

এই মুহূর্তে গাজার পথে ছুটে চলা বহরের প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি মানুষ মানবতার এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের সাহস বিশ্বকে দেখাচ্ছে, অবরোধ ও দমননীতি কোনোদিনই স্থায়ী হতে পারে না। আর হয়তো সেই কারণেই ইতিহাসে এই যাত্রাকে কেবল ফ্রিডম ফ্লোটিলা নয়, বরং মানবতার ফ্লোটিলা হিসেবেই স্মরণ করবে বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত