গাজা যুদ্ধবিরতি: নেতানিয়াহু সরকারের সামনে ভাঙনের সম্ভাবনা বাড়ছে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৮০ বার
গাজা যুদ্ধবিরতি: নেতানিয়াহু সরকারের সামনে ভাঙনের সম্ভাবনা বাড়ছে

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো গাজায় কিছু বন্দী মুক্তি এবং সীমিত ইস্রায়েলি অভিযান স্থগিত করা, যাতে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা যায়। তবে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, যদি নেতানিয়াহু পরিকল্পনায় রাজি হন এবং হামাসকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হয়, তাহলে তারা সরকার ছেড়ে দিতে পারে।

ওৎজমা ইয়েহুদিত দলের নেতা এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতমার বেন‑গভি বলেছেন, যদি বন্দীদের মুক্তির পরেও হামাস কার্যকর থাকে, তবে তার দল সরকারে থাকতে রাজি হবে না। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, তারা দেশের জন্য চরম বিপর্যয় এবং জাতীয় লজ্জা তৈরি করবে এমন পরিস্থিতির অংশ হতে চান না। তার দলের বক্তব্য অনুযায়ী, যদিও তারা বন্দীদের মুক্তির পক্ষে, কিন্তু এমন কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে আবার ক্ষমতায় বসতে দেওয়া যাবে না যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।

সরকারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র, ধর্মীয়-জায়নবাদী পার্টির নেতা এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচও নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তকে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, গাজায় সামরিক অভিযান স্থগিত রেখে আলোচনায় অংশ নেওয়া হামাসকে কৌশলগত সুবিধা দেবে। তার মতে, যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে হামাসকে সময় দিলে ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য, যা হলো হামাসকে দুর্বল করা এবং গাজাকে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকরণ, তা ব্যাহত হবে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত শান্তি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। নেতানিয়াহু সরকারে কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা যদি সরকারের বাইরে চলে যায়, তাহলে সরকার ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সময়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নেতানিয়াহু এই পরিস্থিতিতে জোটের কট্টরপন্থী অংশীদারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি জানিয়েছেন যে প্রস্তাবটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সীমিত ধাপে কার্যকর হবে এবং কোনো রিস্ক নেওয়া হবে না। কিন্তু কট্টরপন্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যদি তারা দেখেন হামাস ক্ষমতায় টিকে আছে বা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়, তবে তারা সরকার ত্যাগ করবেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মুহূর্তে নেতানিয়াহুর দুটি সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথমটি হলো জোটের ভেতরের কট্টরপন্থী অংশীদারদের প্রতিক্রিয়া, এবং দ্বিতীয়টি হলো আন্তর্জাতিক চাপ যা যুদ্ধ অবিলম্বে থামাতে বলছে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থাকলেও, যদি জোট ভেঙে যায়, তখন যুদ্ধ থামলেও নেতানিয়াহুর সরকার জটিল অবস্থায় পড়বে।

ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে জোট ভাঙন নতুন বিষয় নয়। ছোট দলগুলোর অবস্থান পরিবর্তনের কারণে বহুবার সরকার পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও কট্টরপন্থী অংশীদাররা যদি সরকার ছাড়ে, তাহলে নেতানিয়াহুর শাসনকালের স্থিতিশীলতা নড়বড়ে হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য দুইটি উপায় আছে—কট্টরমিত্রদের আইনগত বা নিরাপত্তাগত আশ্বাস দেওয়া অথবা দ্রুত নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া। তবে কোনো পথই সহজ নয়।

মানবিক পরিস্থিতিও সংকটপূর্ণ। গাজার নাগরিকরা এখনও সহিংসতার মুখোমুখি, বেসামরিক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছেই। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বারবার উল্লেখ করেছেন যে যুদ্ধবিরতি দ্রুত কার্যকর হলে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হবে এবং শিশু ও অসহায়দের জীবন রক্ষা করা যাবে। কিন্তু কট্টরপন্থীরা বলছেন, শান্তি বা যুদ্ধবিরতি তখনই গ্রহণযোগ্য যখন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা থাকে।

পরবর্তী কয়েকদিনে ইসরায়েলের রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে পারে। নেতানিয়াহু কি কট্টরমিত্রদের চাপ উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক চাপ মেনে নেবেন, নাকি সরকার রক্ষার জন্য তাদের ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেবেন—এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের নকশা নির্ধারণ করবে। সারা বিশ্বের নজর এখন নেতানিয়াহু ও তার মিত্রদের প্রতিক্রিয়ার দিকে, কারণ তা নির্ধারণ করবে গাজার মানুষ কতোটা নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা পাবে।

বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করছে যে, যুদ্ধবিরতি একদিকে মানবিক সহায়তার পথ খুললেও অন্যদিকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। নেতানিয়াহুর সরকার এবং জোটের অংশীদাররা এই সংকটের মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমাধান খুঁজতে ব্যস্ত। পুরো অঞ্চলের শান্তি, গাজার মানুষের জীবন রক্ষা এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য এই সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত