প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক,একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভারতের রাজস্থান রাজ্যের রাজধানী জয়পুরে ঘটে গেল এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সওয়াই মান সিং (এসএমএস) হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারের আইসিইউতে রবিবার গভীর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত আটজন রোগী। তাদের মধ্যে চারজন পুরুষ এবং দুজন নারী রয়েছেন। এছাড়া পাঁচজন রোগীর অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি রাতারাতি শুধু জয়পুর নয়, গোটা ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও হাসপাতালের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল ট্রমা সেন্টারের আইসিইউতে। হাসপাতালের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই তা ভয়াবহ রূপ নেয়। ট্রমা সেন্টারের ইনচার্জ অনুরাগ ধাকাড় সাংবাদিকদের জানান, “আমাদের ট্রমা সেন্টারের দুটি আইসিইউ রয়েছে—একটি ট্রমা আইসিইউ এবং একটি সেমি-আইসিইউ। আগুন লাগার সময় সেখানে মোট ২৪ জন রোগী ভর্তি ছিলেন, যার মধ্যে ১১ জন ছিলেন ট্রমা আইসিইউতে।”
আগুন লাগার মুহূর্তে আইসিইউজুড়ে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। রোগীদের অনেকেই কোমায় ছিলেন, ফলে তাদের সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। হাসপাতালে কর্মরত নার্স ও স্টাফরা তৎক্ষণাৎ রোগীদের ট্রলিতে করে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই ধোঁয়া ও আগুনের কারণে ছয়জন রোগীর মৃত্যু হয়, পরে আরও দুইজন মারা যান চিকিৎসাধীন অবস্থায়।
অগ্নিকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই হাসপাতালের আশপাশে শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্বজনরা ছুটে আসেন হাসপাতালে, কিন্তু তখনো জরুরি বিভাগের বাইরে প্রবল বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—কীভাবে দেশের অন্যতম বড় হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
প্রাথমিক তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, বৈদ্যুতিক লাইনের শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। তবে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিশ্চিত হতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে। রাজস্থান রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা এবং দায়ীদের চিহ্নিত করবে।
রাজ্য সরকারের মুখপাত্র জানান, নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। মুখ্যমন্ত্রীও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন।
ভারতের স্বাস্থ্যখাতে এই ধরনের অগ্নিকাণ্ড নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন রাজ্যে হাসপাতালের ওয়ার্ডে আগুন লেগে বহু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অনেকগুলোতেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কার্যত কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া না হওয়া, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি বারবার দুর্ঘটনাকে ডেকে আনছে।
এই ঘটনার পর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছে, যেখানে রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার আশায় হাসপাতালে ভর্তি হন, সেখানে হাসপাতালই যদি প্রাণ কেড়ে নেয় তবে আর কোথায় নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে? এ ঘটনার পর জয়পুরের হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অগ্নিকাণ্ডের পর আইসিইউর ভেতরে অবস্থানকারীরা আতঙ্কে চিৎকার শুরু করেন। অনেকে ধোঁয়ার কারণে শ্বাস নিতে পারছিলেন না। হাসপাতালের কর্মীরা প্রাণপণ চেষ্টা করলেও এত কম সময়ে সবাইকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এদিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসকে ধোঁয়া বের করতে বেশ সময় লেগে যায়।
চিকিৎসকরা বলছেন, আগুন লাগার সময় অধিকাংশ রোগী কোমায় থাকায় তাদের দ্রুত সরানো সম্ভব হয়নি। এ কারণে মৃত্যুর সংখ্যা এতটা বেড়েছে। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এখনো সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন এবং তাদের নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করা হয়নি বলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। সরকার কেবল ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করে দায় এড়াতে চায়। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা এবং সরকারের স্বাস্থ্যখাত অবহেলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, ভারতের মতো একটি দেশে যেখানে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, সেখানে মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া মেনে নেওয়া যায় না।
হাসপাতাল প্রশাসন অবশ্য দাবি করছে, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে রোগীদের বাঁচানোর। ট্রমা সেন্টারের ইনচার্জ অনুরাগ ধাকাড় বলেন, “আমাদের টিম সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। কিন্তু যেসব রোগী কোমায় ছিলেন, তাদের সরানো প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। ধোঁয়া পুরো ওয়ার্ড ভরে যায়, ফলে সময়মতো সবার কাছে পৌঁছানো যায়নি।”
জয়পুরের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ভারতের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলোর নিয়মিত পরিদর্শন, জরুরি মহড়া এবং আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়া ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকানো সম্ভব নয়। একইসঙ্গে প্রতিটি হাসপাতালে প্রশিক্ষিত ফায়ার সেফটি টিম গড়ে তোলার ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।
মর্মান্তিক এই অগ্নিকাণ্ড শুধু আটটি পরিবারকে শোকে নিমজ্জিত করেনি, বরং গোটা ভারতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলোকে নগ্ন করে দিয়েছে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীরা যদি এভাবেই প্রাণ হারান, তবে জনসাধারণের আস্থা পুনর্গঠনে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।