গাজায় শান্তির নতুন ভোর -ট্রাম্পের মধ্যস্থতায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৭ বার
গাজায় শান্তির নতুন ভোর: ট্রাম্পের মধ্যস্থতায়

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫
একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দুই বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানে অবশেষে দেখা দিয়েছে এক নতুন আশার আলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাস অবশেষে গাজা শান্তি চুক্তির প্রথম ধাপে পৌঁছেছে বলে উভয় পক্ষ নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও মানবিক বিপর্যয়ের পর এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেখেন, “সব বন্দিকে খুব শিগগিরই মুক্তি দেওয়া হবে” এবং “ইসরায়েল তাদের সৈন্যদের একটি সম্মত সীমারেখার মধ্যে ফিরিয়ে আনবে।” এই ঘোষণার মাধ্যমে দুই বছর ধরে টানা চলা গাজা সংঘাতের মধ্যে প্রথমবারের মতো উভয় পক্ষের পক্ষ থেকে একই সঙ্গে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল।

হামাসের এক মুখপাত্র চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এটি এক কঠিন ও দীর্ঘ আলোচনার ফল। তবে তিনি জানান, বন্দি বিনিময়ের তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। হামাসের মতে, ইসরায়েল যে বন্দিদের মুক্তি দেবে তাদের নামের তালিকা তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে পায়নি।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই সমঝোতাকে “ইসরায়েলের জন্য এক ঐতিহাসিক দিন” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার তাঁর মন্ত্রিসভা চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য বৈঠকে বসবে এবং অনুমোদনের পরপরই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। ইসরায়েলি সরকারের সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ২টা (লন্ডন সময় দুপুর ১২টা) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই চুক্তি এসেছে এমন এক সময়, যখন গাজার যুদ্ধের দ্বিতীয় বার্ষিকী মাত্র দুই দিন আগে অতিক্রান্ত হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা ইসরায়েলে আকস্মিক হামলা চালিয়ে প্রায় ১,২০০ মানুষকে হত্যা করে এবং ২৫১ জনকে বন্দি করে গাজায় নিয়ে যায়। সেই হামলার জবাবে ইসরায়েল ‘অপারেশন আয়রন সোর্ড’ নামের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, যা এখনো চলছে।

হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৬৭,১৮৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০,১৭৯ জন শিশু। আহতের সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি, এবং গাজা উপত্যকার অবকাঠামোর ৮০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, অন্তত ২৫ লাখ মানুষ—যা গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ—বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

চুক্তির এই প্রথম ধাপের ঘোষণা আসে মিশরের রাজধানী কায়রোতে আয়োজিত এক মধ্যস্থতা বৈঠকের পর, যেখানে মিশর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। গত দুই বছরে একাধিকবার যুদ্ধবিরতির চেষ্টা ব্যর্থ হলেও, এ বার আলোচনায় নতুন গতি আনেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে। তাঁর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, এই চুক্তির লক্ষ্য হলো “তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, সব বন্দিকে মুক্ত করা এবং ধাপে ধাপে গাজার পুনর্গঠন শুরু করা।”

মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “এই সমঝোতা কেবল যুদ্ধের বিরতি নয়, বরং মানবিক পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ।” তারা আশা প্রকাশ করেছে যে, উভয় পক্ষ এখন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হবে।

চুক্তির প্রথম ধাপে যা সম্মত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে—বন্দি বিনিময়, মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি, এবং ইসরায়েলি সেনাদের সীমিত প্রত্যাহার। পরবর্তী ধাপগুলোতে গাজায় একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ মিশন মোতায়েন এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য একটি আন্তর্জাতিক তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, শান্তির এই সূচনা এখনো খুবই নাজুক। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—যেমন হামাসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গাজার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা—এখনো অমীমাংসিত। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “চুক্তির সফলতা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের সদিচ্ছা, বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক তদারকির ওপর।”

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই চুক্তিকে “একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানবিক পদক্ষেপ” বলে অভিহিত করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং চীনও এটিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করেছে যে, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে পরিণত করতে হলে উভয় পক্ষকে পারস্পরিক আস্থা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করতে হবে।

গাজা সিটির এক বাসিন্দা আলা আহমেদ বলেন, “আমরা শান্তি চাই। দুই বছর ধরে আমরা শুধু ধ্বংস দেখেছি। যদি সত্যি যুদ্ধ থেমে যায়, তাহলে হয়তো আবার বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে পারব।” তাঁর এই কথায় ফুটে উঠেছে গাজার সাধারণ মানুষের ক্লান্তি ও আশার মিশ্র অনুভূতি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মধ্যস্থতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতেই নয়, তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আগের প্রশাসনগুলোর ব্যর্থতার পর তাঁর এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব পুনর্গঠনের এক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প নিজে বলেছেন, “এটি শুধু গাজার জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য শান্তির বার্তা।”

তবে সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্পের আগের অনেক ঘোষণার মতো এটিও বাস্তবায়নে জটিলতার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, পশ্চিম তীরের অস্থিরতা এবং ইরান–লেবানন সীমান্তের উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আবারও অস্থির করতে পারে।

বর্তমান চুক্তি কার্যকর হলে এটি হবে ২০২৩ সালের যুদ্ধের পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি। তবে স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়ের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, গাজার পুনর্গঠন, সীমান্ত খুলে দেওয়া এবং মানবিক ত্রাণ অব্যাহত রাখা এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

যুদ্ধবিরতির এ চুক্তি কেবল গাজায় নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের সূচনায় এখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে কায়রো, জেরুজালেম ও ওয়াশিংটনের দিকে—যেখান থেকে শান্তির এই নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত