চীনের রেয়ার আর্থ রপ্তানি নীতিতে কঠোরতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১১১ বার
চীনের রেয়ার আর্থ রপ্তানি নীতিতে কঠোরতা: বিশ্ব প্রযুক্তি বাজারে নতুন উত্তেজনা

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫
একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

চীন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ — “রেয়ার আর্থ” বা দুর্লভ খনিজের রপ্তানি নীতিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরশক্তি, স্মার্টফোন এবং সামরিক শিল্পে ব্যবহৃত এই উপাদানগুলোর ওপর নতুন বিধিনিষেধ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের সঙ্কেত দিচ্ছে — প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের পরবর্তী যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি নতুন একটি নির্দেশনা জারি করে জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে রেয়ার আর্থ আহরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চুম্বক তৈরিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি বিদেশে রপ্তানির আগে সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। একইসঙ্গে চীনা কোম্পানিগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে যাতে তারা সরকারের অনুমতি ছাড়া বিদেশি কোনো সংস্থার সঙ্গে রেয়ার আর্থ খাতে যৌথভাবে কাজ না করে।

এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির কৌশলগত একটি বার্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সেই নীতির পাল্টা জবাব দিচ্ছে, যেখানে ওয়াশিংটন উন্নত চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি চীনে রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এসব প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সামরিক প্রয়োগে ব্যবহৃত হতে পারে, তাই নিরাপত্তার স্বার্থে তা সীমিত রাখা জরুরি। চীন এখন বলছে—তাদের নীতিও ঠিক সেই যুক্তিতেই, “জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার” স্বার্থে গৃহীত।

তবে বাস্তবতা হলো, এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতকে নাড়িয়ে দিতে পারে। রেয়ার আর্থ উপাদান ছাড়া উন্নত যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক মোটর, কম্পিউটার হার্ডড্রাইভ, জেট ইঞ্জিন বা রাডার প্রযুক্তি কার্যত অসম্ভব। বিশ্বের মোট রেয়ার আর্থ উৎপাদনের প্রায় ৬১ শতাংশ এবং এর প্রক্রিয়াজাতকরণের ৯২ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে—এ তথ্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-এর। ফলে বেইজিং যদি রপ্তানিতে কড়াকড়ি করে, তাহলে এর অভিঘাত পড়বে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ পর্যন্ত।

চীনের ঘোষণায় বলা হয়েছে, রেয়ার আর্থ উত্তোলন, গলন (smelting), পৃথকীকরণ, চুম্বক উৎপাদন এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি ছাড়াও এখন থেকে এসব সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং আপগ্রেড করাও অনুমতি ছাড়া বিদেশে রপ্তানি করা যাবে না। অর্থাৎ শুধু উপাদান নয়, বরং এর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রযুক্তি ও দক্ষতাও এখন চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে প্রতিরক্ষা ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে। অনেক বিদেশি অস্ত্র নির্মাতা এবং চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে চীনা উপকরণের ওপর নির্ভরশীল। নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হলে তাদের বিকল্প সরবরাহ উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং জাপানের কোম্পানিগুলোকে নতুন কৌশল নিতে হতে পারে, কারণ চীনের বাইরে রেয়ার আর্থ প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা এখনো সীমিত।

অন্যদিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধেও নতুন মাত্রা যুক্ত হলো এই সিদ্ধান্তে। গত কয়েক মাস ধরে উভয় দেশ বাণিজ্য, শুল্ক ও প্রযুক্তি বিষয়ে টানাপোড়েনে রয়েছে। এমন সময়ে এই ঘোষণা এসেছে, যখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে এই মাসের শেষ দিকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘোষণার মাধ্যমে চীন আলোচনার টেবিলে নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করতে চাইছে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, রেয়ার আর্থ প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। তাই এর অনিয়ন্ত্রিত রপ্তানি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে, পশ্চিমা গণমাধ্যম বলছে, এটি আসলে চীনের একধরনের ‘প্রতিক্রিয়াশীল অর্থনৈতিক অস্ত্র’, যার মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি-নিষেধাজ্ঞার জবাব দিতে চাইছে।

ইতোমধ্যেই চলতি বছরের এপ্রিলে চীন বেশ কয়েকটি রেয়ার আর্থ উপাদানকে তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় যুক্ত করে। এর ফলে বিশ্ববাজারে একসময় মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। এবার নতুন ঘোষণা সেই নিয়ন্ত্রণকে আরও আনুষ্ঠানিক ও কঠোর রূপ দিচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, অস্ত্রশিল্প বা নির্দিষ্ট চিপ কোম্পানির প্রতি কোনো রপ্তানি অনুমতি দেওয়া হবে না।

তবে এই নীতি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; এর পেছনে রয়েছে ভূরাজনৈতিক কৌশল। রেয়ার আর্থকে বলা হয় “২১ শতকের তেল”, কারণ এটি ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প কল্পনাই করা যায় না। চীন বহু বছর ধরে রেয়ার আর্থ খনিজ আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রায় একচেটিয়া অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো এক অর্থে প্রযুক্তিগতভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বিকল্প উৎস তৈরি করার চেষ্টা করছে। দেশটিতে রেয়ার আর্থ খনিজ আহরণে কিছু প্রকল্প সক্রিয় হলেও, প্রক্রিয়াজাতকরণের পর্যাপ্ত অবকাঠামো এখনও তৈরি হয়নি। ফলে নতুন চীনা নীতির ফলে মার্কিন প্রযুক্তি শিল্পে কাঁচামালের সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।

পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তে ইউরোপীয় ইউনিয়নও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইইউ কর্মকর্তারা বলেছেন, যদি চীনের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়, তবে বৈশ্বিক চিপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্পে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।

এদিকে, পশ্চিমা দেশগুলো বারবার অভিযোগ করেছে যে, চীন রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (dual-use) প্রযুক্তি রপ্তানির মাধ্যমে মস্কোকে যুদ্ধ সরঞ্জাম তৈরিতে সহায়তা দিচ্ছে। বেইজিং অবশ্য এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, তাদের রপ্তানি সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া।

রেয়ার আর্থ মূলত ১৭টি রাসায়নিকভাবে ঘনিষ্ঠ উপাদানের একটি পরিবার, যার মধ্যে নিওডিমিয়াম, ইউরোপিয়াম, ইট্রিয়াম ইত্যাদি রয়েছে। এগুলো প্রকৃতিতে প্রচুর পরিমাণে থাকলেও বিশুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া কঠিন এবং উত্তোলন প্রক্রিয়া পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই এই উপাদানগুলোকে “রেয়ার” বা বিরল বলা হয়।

বিশ্বের স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, কম্পিউটার, জেট ইঞ্জিন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার—সবখানেই এই উপাদানগুলো অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, নিওডিমিয়াম ব্যবহৃত হয় শক্তিশালী চুম্বক তৈরিতে, যা ইঞ্জিন, লাউডস্পিকার বা হার্ডড্রাইভকে ছোট অথচ কার্যকর করে তোলে।

চীন গত কয়েক দশকে রেয়ার আর্থ শিল্পে বিপুল বিনিয়োগ করে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। অনেক পশ্চিমা দেশ আগেই এই বাজার থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিল পরিবেশগত কারণে, কিন্তু এখন তারা চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে চীনের প্রতিটি নতুন নীতি আজ শুধু বাণিজ্য নয়, বরং বৈশ্বিক কৌশলগত ভারসাম্যের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব অর্থনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, চীনের এই সিদ্ধান্ত কেবল বর্তমান বাণিজ্য সম্পর্কেই নয়, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি দৌড়েও গভীর প্রভাব ফেলবে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং সামরিক প্রযুক্তিতে চীনকে পেছনে ফেলতে চায়, তেমনি চীন রেয়ার আর্থের ওপর আধিপত্য ধরে রেখে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে।

এই নীতিকে তাই অনেকেই বলছেন “রেয়ার আর্থ কূটনীতি” — যেখানে খনিজ সম্পদ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারমূল্য হ্রাস পাচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীরা বিকল্প সরবরাহ উৎস খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক দেশ, বিশেষ করে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা রেয়ার আর্থ খনির নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধান করছে।

তবে এসব উদ্যোগ ফলপ্রসূ হতে সময় লাগবে। ততদিন পর্যন্ত বিশ্বের প্রযুক্তি খাতকে চীনের নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা মেনে চলতেই হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, “রেয়ার আর্থের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ এখন আর শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি এক ধরনের বৈশ্বিক শক্তির প্রতীক।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত