একদিকে ট্রাম্পের শান্তি চুক্তি অন্য দিকে গাজার আকাশে যুদ্ধ বিমান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৯ বার
একদিকে ট্রাম্পের শান্তি চুক্তি অন্য দিকে গাজার আকাশে যুদ্ধ বিমান

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫
একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের চুক্তি স্বাক্ষরের খবর বিশ্বজুড়ে আলোচনায় থাকলেও, বাস্তব চিত্র একেবারে ভিন্ন। গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও ইসরাইলি সেনাবাহিনী অব্যাহত রেখেছে বিমান ও স্থল হামলা। আল জাজিরা, বিবিসি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গাজার বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া গেছে, যদিও সঠিক সংখ্যা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

এই পরিস্থিতি বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন এক অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রশাসন “শান্তির সূচনা” বলে চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে, অন্যদিকে গাজার আকাশে এখনো উড়ছে যুদ্ধবিমান, মাটিতে চলছে গোলাবর্ষণ। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণাটি এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম “ট্রুথ সোশ্যাল”-এ দেওয়া এক পোস্টে ঘোষণা দেন যে, “সব বন্দিকে খুব শিগগিরই মুক্তি দেওয়া হবে” এবং “ইসরাইল তাদের সৈন্যদের নির্ধারিত সম্মত সীমারেখার মধ্যে ফিরিয়ে আনবে।” তাঁর ভাষ্যমতে, এটি তাঁর প্রস্তাবিত গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই ঘোষণা সত্ত্বেও যুদ্ধের আগুন নিভেনি, বরং কিছু স্থানে তা আরও তীব্র হয়েছে।

গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শাতি শরণার্থী শিবিরে একটি পরিবারের বাড়ি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করা হয়, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার রাতে ও বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত গাজার বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

অন্যদিকে, গাজা সিটির দক্ষিণের সাবরা মহল্লায় একটি আবাসিক এলাকায় গাড়ি বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের পর পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং আশপাশের কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন পর্যন্ত হতাহতের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য না পাওয়া গেলেও স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আহতদের কয়েকজনকে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক সশস্ত্র হামলার পর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে সম্প্রতি। ওইদিন হামাস-নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশ করে ব্যাপক আক্রমণ চালায়, যাতে প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে বন্দি করা হয়। তার জবাবে ইসরাইল গাজায় শুরু করে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সামরিক অভিযান।

দুই বছরের এই যুদ্ধে গাজার পরিস্থিতি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৬৭,১৮৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০,০০০-এর বেশি শিশু। আহত হয়েছেন এক লাখ ৬৯ হাজারেরও বেশি মানুষ, এবং বহু নাগরিক এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর অনেকেই আশা করেছিলেন, অবশেষে হয়তো গাজায় শান্তির নতুন অধ্যায় শুরু হবে। কিন্তু ইসরাইলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত থাকায় সেই আশা এখন অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা পড়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী অবশ্য বলছে, “নির্দিষ্ট কিছু সামরিক লক্ষ্যে হামলা চালানো হচ্ছে,” যা তারা “আত্মরক্ষার অংশ” হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে “ইসরাইলের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন” বলে উল্লেখ করেছেন এবং জানিয়েছেন, তাঁর মন্ত্রিসভা এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুমোদনের জন্য বৈঠকে বসবে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসরাইলি সরকারের অভ্যন্তরে এখনো বিভাজন রয়েছে—বিশেষ করে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছে, হামাসকে পুরোপুরি দুর্বল না করা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি টেকসই হবে না।

অন্যদিকে, হামাসও যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বীকার করলেও তারা জানিয়েছে, ইসরাইলের পক্ষ থেকে বন্দি বিনিময়ের তালিকা এখনো চূড়ান্তভাবে হাতে আসেনি। হামাসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা শান্তির পথে এগোতে চাই, কিন্তু ইসরাইলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুই নিশ্চিত বলা যাবে না।”

মিসরে গাজার শান্তি নিয়ে ট্রাম্পের জামাতা দূত হিসাবে আলোচনায় এবং ট্রাম্পের উদ্দ্যুগ বৈঠক এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে—গাজা সংকটের সমাধান কেবল কূটনৈতিক টেবিলে নয়, বরং বাস্তব মাটিতে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। দুই পক্ষের মধ্যকার আস্থা পুনর্গঠন এখনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত টর ওয়েনসল্যান্ড এক বিবৃতিতে বলেন, “যুদ্ধবিরতির প্রতিটি ঘণ্টা গাজাবাসীর জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা যদি সহিংসতা অব্যাহত দেখি, তাহলে এই চুক্তি অর্থহীন হয়ে যাবে।”

এই বাস্তবতায় মিশর, কাতার ও তুরস্ক নতুন করে মধ্যস্থতা শুরু করেছে। কায়রোতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিভিন্ন পক্ষ যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের প্রযুক্তিগত দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেছে বলে জানা গেছে। তবে, গাজায় চলমান হামলার কারণে সেই প্রচেষ্টাগুলিও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

গাজা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। জাতিসংঘের হিসাবে, উপত্যকার প্রায় ৮০ শতাংশ অবকাঠামো সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে ওষুধের অভাব, পানির সংকট, এবং খাদ্য সরবরাহ প্রায় বন্ধের পথে। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে অব্যাহত গোলাবর্ষণের কারণে।

ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং কানাডা উভয় পক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, “যুদ্ধবিরতি তখনই অর্থবহ, যখন বোমা ও গুলি থামে।”

তবে ওয়াশিংটন এখনো ইসরাইলের ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগে সতর্ক ভূমিকা নিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন চায়, এই চুক্তি তাঁর নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনার সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠুক। তাই তাঁরা এখনো “ধৈর্য” ও “সমঝোতা”র আহ্বান জানাচ্ছেন।

অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ হলেও, স্থায়ী শান্তির পথে এটি একটি অতি ক্ষুদ্র সূচনা মাত্র। কারণ, গাজা পুনর্গঠন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, শরণার্থী প্রত্যাবর্তন এবং ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি—এসব মৌলিক ইস্যু এখনো অমীমাংসিত।

বিগত দুই বছরে এই যুদ্ধ শুধু গাজার ভূখণ্ড নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যও বদলে দিয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ থেকে শুরু করে ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড পর্যন্ত অনেক আঞ্চলিক শক্তি এই সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে গাজা যুদ্ধবিরতি মানেই বৃহত্তর শান্তি নয়—এটি কেবল একটি অস্থায়ী বিরতি, যা যেকোনো সময় আবার ভেঙে পড়তে পারে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, গাজার এই পরিস্থিতি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উভয়ই আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছে, “যুদ্ধবিরতি ঘোষণা যদি বাস্তবে প্রতিফলিত না হয়, তবে এটি আরেকটি কূটনৈতিক নাটক হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।”

সাক্ষরতার প্রকৃত চিত্র নিয়ে নতুন করে বিতর্ক

গাজার মানুষের কাছে যুদ্ধবিরতির অর্থ এখন কেবল একটি শব্দ নয়—এটি বেঁচে থাকার আশার প্রতীক। কিন্তু সেই আশাও আজ আবার মেঘাচ্ছন্ন। আকাশে ড্রোনের গর্জন, মাটিতে ধুলো-ধোঁয়ার মিশ্রণ, এবং মৃত্যুর ভয়ে ছুটে বেড়ানো মানুষ—এই হলো যুদ্ধবিরতির পরও গাজার বাস্তব চিত্র।

পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—যুদ্ধবিরতি শুধু ঘোষণা দিলেই হয় না, সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন বিশ্বাস, দায়িত্বশীলতা এবং মানবতার প্রতি অঙ্গীকার। আর সেই অঙ্গীকারের অপেক্ষাতেই আজ পুরো গাজা উপত্যকা

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত