প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলো যুক্তরাজ্য ও ভারত। বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) মুম্বাইয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৪৬৮ মিলিয়ন ডলারের (৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড) একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন ভারতীয় সেনাবাহিনীকে উন্নতমানের হালকা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে, যা দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে।
বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় মুম্বাইয়ের বাণিজ্যিক কেন্দ্রস্থলে, যেখানে দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। নরেন্দ্র মোদি বৈঠক শেষে এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে এই সম্পর্ক শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের দিকেও অগ্রসর করবে।”
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, “এটি কেবল একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়, বরং দুই গণতান্ত্রিক দেশের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি। আমরা একসাথে নিরাপত্তা, উদ্ভাবন এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছি।”
প্রতিরক্ষা চুক্তির পাশাপাশি উভয় দেশ বিদ্যুৎচালিত নৌজাহাজের ইঞ্জিন উৎপাদনে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণে সম্মত হয়েছে। ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের এই প্রকল্পে দুই দেশ টেকসই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য একসঙ্গে কাজ করবে। ব্রিটিশ সরকারের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এটি ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত জুলাই মাসে ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই বৈঠক দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করল। বৈঠকে ২০৪০ সালের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এ লক্ষ্যে টেক্সটাইল, গাড়ি, হুইস্কি ও বিলাসবহুল পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায় দুই দেশ।
চুক্তি অনুযায়ী, ভারত ব্রিটিশ পণ্যের ওপর গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশে আনবে, অপরদিকে যুক্তরাজ্য ভারতীয় পোশাক, জুতা, অলংকার ও সামুদ্রিক খাদ্যপণ্যের ওপর কর কমাবে। একই সঙ্গে ভারতও স্কচ হুইস্কি, প্রসাধনী, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে কর ছাড় দেবে। ফলে দুই দেশের বাজারে পারস্পরিক প্রবেশাধিকার আরও সহজ হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, “এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে দ্বিগুণ করা এবং আগামী এক বছরের মধ্যে এই চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এতে কয়েক হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে।”
এছাড়া, স্টারমার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ লাভের জন্য ভারতের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। এই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকের আগে বুধবার দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উন্নত প্রযুক্তি, ডিজিটাল বাণিজ্য ও ক্লিন এনার্জি খাতে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, নতুন যুগের উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতিতে ব্রিটেন ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতা উভয় দেশকেই বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানানো হয়, বর্তমানে ৬৪টি ভারতীয় কোম্পানি যুক্তরাজ্যে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ড (১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ করেছে। এই নতুন চুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং প্রযুক্তি খাতে যৌথ গবেষণা ও উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শিক্ষা খাতেও দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। বৈঠকে স্টারমার ঘোষণা দেন যে, ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভারতে আরও নতুন ক্যাম্পাস চালু করবে। ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় বেলফাস্ট আগামী বছরের শুরুতে ভারতে তাদের শাখা খোলার পরিকল্পনা করেছে। এতে কমপক্ষে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
দুই দিনের এই সফরে কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে রয়েছেন এক শতাধিক ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং সংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ। মুম্বাই শহরজুড়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্টারমারের স্বাগত জানাতে হাজারো ব্যানার ও আলোকচিত্রে সজ্জিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত ও ব্রিটেনের এই অংশীদারিত্ব প্রমাণ করছে যে, ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রে অবস্থান করবে সহযোগিতা, প্রযুক্তি এবং আস্থা—আর সেই যৌথ শক্তির ভিত্তিতেই গড়ে উঠবে আগামী দিনের বৈশ্বিক নেতৃত্ব।