প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে যেন আগুন ঝরানো ফুটবলের প্রদর্শনী করল ব্রাজিল। সিউলের বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামে শুক্রবার রাতের ম্যাচে গোলের পর গোল করে এশিয়ার শক্তিশালী দলটিকে অসহায় করে তোলে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। শেষ পর্যন্ত ৫–০ গোলের বিশাল জয়ে মাঠ ছাড়ে সাম্বা সেনারা।
এই ম্যাচে জোড়া জোড়া গোল করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন এস্তেবাও ও রদ্রিগো। আর একটি গোল করেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। পুরো ম্যাচে বল দখল, পাসের নির্ভুলতা, আক্রমণের গতি—সব দিকেই প্রাধান্য বিস্তার করে ব্রাজিল যেন তাদের ঐতিহ্যিক ছন্দে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিল।
সিউলের আকাশে যখন সন্ধ্যার আলো মিলিয়ে যাচ্ছিল, তখন ব্রাজিলের আক্রমণভাগ ক্রমশ রঙিন হতে থাকে। খেলার শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের অর্ধে প্রভাব বিস্তার করে ব্রাজিল। মাত্র ১৩ মিনিটের মাথায় আসে প্রথম গোল। ব্রুনো গিমারেসের সূক্ষ্ম পাস ধরে বল পেয়ে বাম দিক থেকে ডি-বক্সে ঢুকে নিখুঁত শটে জালের দেখা পান তরুণ ফরোয়ার্ড এস্তেবাও। গোলটি যেন গোটা ম্যাচের দিকনির্দেশনা তৈরি করে দেয়।
প্রথমার্ধের বাকি সময়েও ব্রাজিলের আক্রমণের ধার কমেনি। দক্ষিণ কোরিয়ার রক্ষণভাগ ছিল বারবার চাপের মুখে। একের পর এক পাস ও মুভমেন্টে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে স্বাগতিক দল। ৪১ মিনিটে রদ্রিগোর দূরপাল্লার এক কোনাকুনি শট প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের হাত ফসকে জালে ঢুকে যায়। এই গোলের মধ্য দিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের তারকা আনচেলত্তির অধীনে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের জার্সিতে গোল করার আনন্দ পান।
বিরতির পর মাঠে নেমেই ব্রাজিল যেন আরও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। মাত্র দুই মিনিটের ব্যবধানে আসে দুটি গোল। ৪৭ মিনিটে প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবারও গোল করেন এস্তেবাও। বাঁ পায়ের অসাধারণ শটে বল জড়িয়ে যায় জালে। দর্শকদের উল্লাসে তখন মুখরিত সিউল স্টেডিয়াম।
দুই মিনিট পরেই গোলের তালিকায় নিজের নাম দ্বিতীয়বারের মতো লেখান রদ্রিগো। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের বাড়ানো বল থেকে তিনি দারুণ কোনাকুনি শটে গোল করেন। এই মুহূর্তে ব্রাজিলের আক্রমণভাগে রদ্রিগো, ভিনিসিয়াস ও এস্তেবাও যেন এক অনন্য ত্রিমূর্তি। তাঁদের গতি, ড্রিবলিং, এবং সমন্বিত আক্রমণে কোরিয়ার রক্ষণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
খেলার ৭৭ মিনিটে এবার নিজেই স্কোরশিটে নাম তোলেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে নিজের স্বভাবসুলভ গতিতে এগিয়ে গিয়ে দারুণ এক একক প্রচেষ্টায় গোল করেন তিনি। বল পায়ের নিচে রেখে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের ধাঁধিয়ে যে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য দেখিয়েছেন, তাতে বোঝা গেল কেন তিনি বর্তমানে বিশ্বের সেরা উইঙ্গারদের একজন।
পুরো ম্যাচজুড়ে ব্রাজিলের দাপট ছিল একেবারে নিখুঁত। ৭০ শতাংশেরও বেশি সময় বলের দখল ছিল তাদের হাতে। পাস এক্যুরেসি ছিল ৯০ শতাংশের ওপরে। কোরিয়ার গোলরক্ষক ও ডিফেন্ডারদের সামনে যেন এক অনিবার্য ঝড় বয়ে যায়, যার থামার উপায় ছিল না।
দক্ষিণ কোরিয়া চেষ্টা করেছিল পাল্টা আক্রমণে সুযোগ তৈরি করতে, কিন্তু ব্রাজিলের রক্ষণভাগ ছিল একেবারে অটল। মারকুইনহোস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের নেতৃত্বে রক্ষণে কোনো ফাঁক রাখেননি কোচ কার্লো আনচেলত্তি। গোলরক্ষক আলিসনও ছিলেন সজাগ। কয়েকটি বিপজ্জনক আক্রমণ ঠেকিয়ে দলকে ক্লিনশিট এনে দেন।
ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি ম্যাচ শেষে সন্তুষ্টির হাসি নিয়ে বলেন, “এই জয় কেবল স্কোরলাইনের নয়, দলীয় সমন্বয়ের জয়। তরুণ খেলোয়াড়রা আজ দারুণ খেলেছে। আমরা নতুন প্রজন্মকে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ দিচ্ছি, আর তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।”
এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার কোচ জার্গেন ক্লিনসম্যান ম্যাচ শেষে স্বীকার করেন, “ব্রাজিল আজ একদম অন্য পর্যায়ের ফুটবল খেলেছে। আমাদের রক্ষণভাগ তাদের গতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি। কিন্তু এই ম্যাচ থেকে আমরা শিক্ষা নেব।”
এই জয় শুধু একটি প্রীতি ম্যাচ নয়, বরং ব্রাজিলের ফুটবল দর্শনের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলটি যে ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিল, তা যেন ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছে। তরুণ প্রতিভা এস্তেবাও ও রদ্রিগোর পারফরম্যান্সে ফুটে উঠেছে ভবিষ্যতের সাম্বা যুগের সম্ভাবনা।
ব্রাজিলের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। টুইটার ও ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে “#SambaIsBack” হ্যাশট্যাগ। অনেকেই লিখেছেন, “এই ব্রাজিল আমাদের পুরনো দিনের ব্রাজিল।”
এস্তেবাও ম্যাচ শেষে বলেন, “ব্রাজিলের জার্সিতে প্রতিটি গোলই গর্বের। আজকের পারফরম্যান্স ছিল দলীয় ঐক্যের ফসল। আমাদের লক্ষ্য পরের বিশ্বকাপে আগের সব সমালোচনার জবাব দেওয়া।”
দলটি এখন পরবর্তী ম্যাচের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আগামী ১৪ অক্টোবর টোকিওতে স্বাগতিক জাপানের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। ম্যাচটি ঘিরে এখন থেকেই বাড়ছে আগ্রহ। এশিয়ার দুটি শক্তিশালী দলের এই মুখোমুখি লড়াইয়ে ব্রাজিল কি তাদের গোল উৎসব অব্যাহত রাখতে পারবে?
যেভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিল মাঠজুড়ে আধিপত্য দেখিয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে—দলটি ধীরে ধীরে তাদের হারানো সাম্বা ছন্দে ফিরছে। ফুটবলপ্রেমীরা এখন নতুন করে আশাবাদী, বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে আবারও দেখা মিলবে সেই স্বপ্নময় ব্রাজিলের, যারা মাঠে নামলেই আনন্দ, সৌন্দর্য ও জয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।