মেক্সিকোতে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৪৪

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৫ বার
বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৪৪

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক

মেক্সিকোতে টানা বৃষ্টিপাত ও ভয়াবহ বন্যায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে একাধিক রাজ্য। প্রলয়ংকারী বন্যা ও ভূমিধসে দেশটিতে অন্তত ৪৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, যদিও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি— প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। চলমান বিপর্যয়ে লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মেক্সিকোর ভেরাক্রুজ, পুয়েবলা ও হিডালগো প্রদেশগুলো এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বলে জানা গেছে।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুটি শক্তিশালী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়— প্রিসিলারেমন্ড—এর প্রভাবে গত সপ্তাহজুড়ে দেশজুড়ে শুরু হয় ভারী বর্ষণ। অবিরাম বৃষ্টিপাতে নদ-নদীর পানি উপচে পড়ে গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ে বন্যা। ভূমিধসের কারণে বন্ধ হয়ে যায় একাধিক মহাসড়ক, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গ্রামীণ যোগাযোগ। সরকারের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, ভেরাক্রুজে সবচেয়ে বেশি ১৮ জন, হিডালগোতে ১৬ জন, পুয়েবলায় ৯ জন এবং কুয়েরেতারোতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এল ইউনিভার্সাল অবশ্য মৃতের সংখ্যা ৪৮ বলে জানিয়েছে।

বন্যার তাণ্ডবে তিন লাখেরও বেশি মানুষ বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছেন। মেক্সিকোর জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অন্তত ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভুগছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ঘরবাড়ি। অনেক পরিবার এখনো তাদের নিখোঁজ সদস্যদের খুঁজে ফিরছেন। গ্রামীণ এলাকায় অনেকে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ নদীপাড়ের গাছ বা ছাদের ওপর অপেক্ষা করছেন উদ্ধারকর্মীদের আগমনের জন্য।

দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম পরিস্থিতিকে “মেক্সিকোর সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী ও জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (সেডেনা) উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমরা নাগরিকদের পাশে আছি। যেসব পরিবার প্রিয়জন হারিয়েছেন বা গৃহহীন হয়েছেন, তাদের জন্য আমরা সবধরনের সহায়তা নিশ্চিত করছি।”

আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, ৬ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া বর্ষণ তিন দিনের মধ্যে ভেরাক্রুজে ৫৪০ মিলিমিটার বা ২১ ইঞ্চির বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে— যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রবল বর্ষণে নদী-খাল উপচে পড়ায় পুরো এলাকা তলিয়ে যায়। ৯ অক্টোবরের পর থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও ভূমিধস, গাছ উপড়ে পড়া ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই মূহুর্তে মেক্সিকোর রাস্তাঘাটে এখন শুধু ধ্বংসের চিহ্ন। কাদামাটি, গাছের গুঁড়ি, ভাঙা ছাদ আর ডুবে যাওয়া গাড়িতে ভরে গেছে শহরগুলো। উদ্ধারকর্মীরা নৌকা, হেলিকপ্টার ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দুর্গম এলাকা থেকে মানুষজনকে সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেক গ্রাম এখনো পানিতে ডুবে থাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।

ভেরাক্রুজের এক প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া মারিয়া গনজালেজ নামের এক নারী স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা এমন বন্যা কখনো দেখিনি। এক রাতেই আমাদের ঘর, ফসল, এমনকি জীবনের সঞ্চয় সব ভেসে গেছে। আমার স্বামী এখনো নিখোঁজ।” তার মতো শত শত মানুষ এখন সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন, অপেক্ষা করছেন নিরাপদ জীবনে ফেরার।

হিডালগো প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের কারণে বহু ঘরবাড়ি মাটিচাপা পড়েছে। উদ্ধারকর্মীরা জানাচ্ছেন, এখনো অনেক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা থাকতে পারেন। সেনা সদস্যরা বুলডোজার ও হাতের সরঞ্জাম দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মেক্সিকোর জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা দপ্তর জানিয়েছে, এসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার অভিযান বিলম্বিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, পুয়েবলা প্রদেশে বন্যার পানিতে কয়েকটি স্কুল ও হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ পাঠানো হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়। দুর্যোগের পর রোগব্যাধির ঝুঁকি এড়াতে পরিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা (OCHA) বলেছে, এই দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা লাখ ছাড়াতে পারে। অনেক এলাকা এখনো উদ্ধারকাজের আওতায় আসেনি, ফলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণচিত্র পেতে আরও সময় লাগবে। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, “দ্রুত খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠানোর জন্য।”

এদিকে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো উদ্ধারকর্মীদের সীমাহীন পরিশ্রমের গল্প তুলে ধরছে। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সেনা ও স্বেচ্ছাসেবীরা পানির স্রোত উপেক্ষা করে একে একে মানুষ উদ্ধার করছেন। শিশু ও বয়স্কদের কোলে তুলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া দৃশ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

মেক্সিকোর আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, আসন্ন দিনগুলোতেও মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই কর্তৃপক্ষ সবাইকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার আহ্বান জানিয়েছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মেক্সিকো এখন আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের ঘনঘন আঘাতে দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলগুলো বারবার বন্যার কবলে পড়ছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত নির্মাণকাজও এই দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত