যুদ্ধবিরতির মাঝেই গাজায় ইসরাইলি হামলা, নিহত ৯

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৯ বার
গাজায় ইসরায়েলের হামলায় নিহত ৬৩, শিশুদের সংখ্যা ২৪

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও গাজায় আবারও রক্ত ঝরল। আন্তর্জাতিক শান্তি উদ্যোগের মধ্যেই মঙ্গলবার ইসরাইল বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারালেন আরও নয়জন ফিলিস্তিনি। গাজা সিটির দুটি পৃথক এলাকায় সংঘটিত এই হামলা একদিকে যেমন যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, অন্যদিকে তা আবারও প্রমাণ করেছে—হামাস মানুষের জীবন আজও এক অনিশ্চয়তার দোলাচলে ঝুলে আছে।

মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যার দিকে গাজা সিটির কেন্দ্রীয় অঞ্চল ও উত্তরের আবাসিক এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা শোনার পর অনেক ফিলিস্তিনি তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে ফেরার উদ্দেশ্যে রাস্তায় বের হয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধের পর সেই একটুখানি স্বস্তির সুযোগে কেউ কেউ খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করছিলেন, কেউ ফিরছিলেন নিজেদের ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরের সামনে। ঠিক সেই সময়ই ইসরাইলি সেনারা গুলি চালায়।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের সেনা সদস্যদের “অত্যন্ত কাছাকাছি” চলে এসেছিল কিছু ব্যক্তি, যাদের “সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী” মনে করে তারা গুলি চালায়। কিন্তু ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দাবি, নিহতরা সবাই বেসামরিক মানুষ। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ও এক বৃদ্ধও রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল-কুদরাহ বলেন, আহতদের দ্রুত গাজার আল-আহলি ও আল-নাসের হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা নয়জনকে মৃত ঘোষণা করেন। আরও কয়েকজন গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতালের করিডরজুড়ে এখন শোক ও হতাশার চিত্র। চিকিৎসকদের চোখেমুখে ক্লান্তি, নার্সদের হাতে অবিরাম কাজ—গাজা যেন মৃত্যুর নগরীতে পরিণত হয়েছে।

মাত্র একদিন আগেই, ১৩ অক্টোবর, যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে হামাস ২০ জন ইসরাইলি জিম্মিকে জীবিত অবস্থায় মুক্তি দিয়েছিল। অপরদিকে, ইসরাইল সরকারও ১৭০০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেয়, যাদের মধ্যে গুরুতর সাজাপ্রাপ্ত আড়াইশ বন্দিও ছিলেন। সেই মুক্তির পর খান ইউনিসের নাসের হাসপাতাল এলাকায় স্বজনদের ভিড় জমে যায়। কেউ কাঁদছিলেন আনন্দে, কেউ হারানো পরিবারের খোঁজে ভিড়ের ভেতর খুঁজে ফিরছিলেন পরিচিত মুখ।

কিন্তু সেই মানবিক দৃশ্যের পরের দিনই আবারও ধ্বংসের রক্তাক্ত অধ্যায়। গাজা সিটির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ইসরাইলি ড্রোনের গুঞ্জন যেন মানুষকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—যুদ্ধবিরতি হয়তো কাগজে লেখা, বাস্তবে নয়।

দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলা এই যুদ্ধের পটভূমিতে এমন হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেন, “যুদ্ধবিরতি মানে যুদ্ধের বিরতি, সেটি যেন নতুন যুদ্ধের সূচনা না হয়।” ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তুরস্ক ও কাতারও নতুন করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছে এবং ইসরাইলকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে।

মঙ্গলবারের এই হামলা গাজার সাধারণ মানুষের মনে আবারও ভয় ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির খবরে কিছুটা আশার আলো দেখলেও এখন তারা বুঝতে পারছেন—তাদের স্বপ্নের শান্তি এখনো অনেক দূরে। স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, গাজার বহু এলাকায় এখনো ইসরাইলি ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে, যা বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলছে।

হামাসের মুখপাত্র ফাওজি বারহুম এক বিবৃতিতে বলেন, “ইসরাইলের এই হামলা যুদ্ধবিরতির প্রতি স্পষ্ট অবমাননা। এটি শুধু একটি চুক্তি লঙ্ঘন নয়, এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।” তিনি আরও বলেন, “গাজার মানুষ শান্তি চায়, কিন্তু তাদের ওপর বারবার যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

অপরদিকে, তেল আবিবের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, হামাস এখনও তাদের প্রতিশ্রুত জিম্মিদের সম্পূর্ণ মুক্তি দেয়নি। তারা অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পারস্পরিক অবিশ্বাসই শান্তি প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত ব্যাহত করছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরাইলি নিহত হন এবং ২৫১ জন জিম্মি হন। সেই হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরাইল যে সামরিক অভিযান শুরু করে, তা এখন দুই বছর পেরিয়ে গেলেও থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গাজার স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় প্রায় ৬৮ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আরও হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা এখন এক মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক। ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল—সবকিছুই যেন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। জাতিসংঘ বলছে, গাজার ৮০ শতাংশ মানুষ এখন মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য, পানি ও ওষুধের সংকট প্রতিদিনই নতুন নতুন মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা নতুন করে শান্তি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, মিশর ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও তা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রিমা হামদান বলেন, “আমরা শুধু চাই আমাদের সন্তানরা ভয়ে কাঁপতে না কাঁপতে ঘুমাক। শান্তি এখন আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো।”

গাজা ও তেল আবিবের মধ্যে এই অনন্ত সংঘাত যেন মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। যুদ্ধবিরতি নামের কাগুজে প্রতিশ্রুতির মধ্যেও গাজার আকাশে ধোঁয়া উঠছে, শোক ভাসছে প্রতিটি ঘরে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই রক্তপাত থামার কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না।

যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে মঙ্গলবারের হামলা আবারও স্পষ্ট করে দিল—যেখানে রাজনীতি ব্যর্থ, সেখানেই মানুষ হারায় মানবতা। গাজায় আজ শান্তির চেয়ে মৃত্যুই বেশি বাস্তব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত