মেজর জেনারেল কবির ‘নিখোঁজ’ রহস্য: নিখোঁজ থাকার পরও ৭৭ লাখ টাকার লেনদেন, সেনাবাহিনীর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৮৩ বার

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক |

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল কবির আহমেদ নিখোঁজ ঘোষণার পরও তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ৭৭ লাখ টাকার বেশি অর্থ স্থানান্তরের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় শুধু সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রশাসন নয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি ব্যবস্থা ও তথ্য স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন এবং অনলাইন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘটনাটি এখন প্রশাসনিক গোপনীয়তা, আর্থিক অনিয়ম ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট তদন্তের জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে।

১১ অক্টোবর ২০২৫, সেনাসদরে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) থেকে মেজর জেনারেল কবির আহমেদসহ ১৬ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ওয়ারেন্ট সেনাবাহিনী পায়নি। তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন ও জুলাই বিদ্রোহের সময় বেসামরিক নাগরিক হত্যার অভিযোগে যে তদন্ত চলছে, সেটি সেনাবাহিনীর কাছে তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছেনি।

কিন্তু একাধিক সূত্রের যাচাই ও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী আসলে ৯ অক্টোবরেই সেই ওয়ারেন্টগুলো হাতে পেয়েছিল, অর্থাৎ সংবাদ সম্মেলনের দুই দিন আগেই। এই সময়রেখা সেনা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্ট অসঙ্গতি তৈরি করে এবং প্রশ্ন তোলে—তথ্যটি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা হয়েছিল কি না, নাকি প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

একইসঙ্গে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়টি হলো মেজর জেনারেল কবিরের নিখোঁজ থাকা সত্ত্বেও তার অ্যাকাউন্ট থেকে বড় অঙ্কের লেনদেন। সেনা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ৯ অক্টোবর সকাল থেকে নিখোঁজ। কিন্তু ব্যাংকিং ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেদিন বিকেল ৩টা ০৫ মিনিটে ৪ লাখ টাকা এবং সন্ধ্যা ৫টা ১০ মিনিটে আরও ৭৩ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয় তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে। অর্থাৎ যেদিন তাকে নিখোঁজ বলা হচ্ছে, সেই দিনই তার নামে বিপুল পরিমাণ টাকা সরানো হয়।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, যদি তিনি নিখোঁজই হয়ে থাকেন, তবে কে বা কারা তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল? যদি তিনি নিজে লেনদেন করে থাকেন, তবে সেনাবাহিনীর নিখোঁজ দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? আর যদি অন্য কেউ করে থাকে, তবে সেটি কীভাবে সম্ভব হলো, ট্রাস্ট ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে?

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কবির আহমেদের আর্থিক লেনদেনের ধারা সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ২১ সেপ্টেম্বর অনলাইনে তিনি ৩৫ লাখ টাকা স্থানান্তর করেন, নয় মিনিট পর আরও ৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। ৫ অক্টোবর তার ট্রাস্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতন জমা হয় ২:১৬ মিনিটে, এবং ৭ অক্টোবরের মধ্যে ব্যালেন্স দাঁড়ায় ৮২ লাখ টাকারও বেশি। ৬ অক্টোবর আরেকটি অ্যাকাউন্ট থেকে ২ লাখ টাকা, ৭ অক্টোবর ৩.৫ লাখ টাকা, ৮ অক্টোবর ৫ লাখ টাকা এবং ৯ অক্টোবরের বিশাল ৭৭ লাখ টাকার স্থানান্তর—সবমিলিয়ে এক পরিকল্পিত অর্থ ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত মেলে।

একই দিনে আরও একটি রহস্যময় উপাদান যোগ হয়। ৫ অক্টোবর রাত ১১টা ১৭ মিনিটে একটি বার্তা আসে কবির আহমেদের মোবাইলে—একজন ব্যক্তি, যিনি নিজেকে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন, জানান, “উত্তরায়ণ A3 অ্যাপার্টমেন্ট আপনার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।” বার্তাটির সময়কাল, যখন তার উত্তোলন কার্যক্রম দ্রুততর হচ্ছিল, বিশেষজ্ঞদের মতে এটি একটি সম্ভাব্য সংকেত বা আশ্রয় সংক্রান্ত বার্তা হতে পারে। বার্তা প্রেরকের নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে নম্বরটি (০১৭৭৫৬০XXXX) সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে মিলে যায় বলে জানা গেছে।

তদন্তকারীদের ধারণা, “উত্তরায়ণ A3” কোডটি হয়তো নিরাপদ আশ্রয়, পুনর্বাসন পরিকল্পনা বা নির্দেশিত সুরক্ষিত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। এটি যদি সত্য হয়, তবে বোঝা যায়, নিখোঁজ ঘোষণার আগেই কবির আহমেদকে গোপনে সুরক্ষিত স্থানে নেওয়া হয়েছিল বা তিনি নিজেই পূর্বপ্রস্তুতিতে ছিলেন।

এই সমস্ত তথ্য একত্রে ইঙ্গিত দেয়, সেনাবাহিনীর ভেতরে তথ্য গোপন, প্রশাসনিক অসঙ্গতি এবং আর্থিক অনিয়মের সম্ভাব্য জটিলতা রয়েছে। আইসিটি ওয়ারেন্টের বিষয়টি যেমন অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে, তেমনি নিখোঁজ থাকা অবস্থায় আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সেনাবাহিনীর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন তদন্তাধীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এক দিনে ১ কোটি টাকারও বেশি অর্থ স্থানান্তর করতে পারছেন—এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং তদারকি ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন। ট্রাস্ট ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের লেনদেন মনিটরিং সিস্টেমে এই ধরনের অস্বাভাবিক কার্যক্রম নজরে না আসা বা প্রতিরোধ না করা প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনী বলছে, তারা বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করছে এবং আইসিটি’র সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে। তবে এখন পর্যন্ত মেজর জেনারেল কবির আহমেদের অবস্থান, তার আর্থিক লেনদেনের ব্যাখ্যা এবং ৫ অক্টোবরের রহস্যময় এসএমএসের উৎস সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।

মানবাধিকার ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বচ্ছতা, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা বলছেন, “যে কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যদি আইনি জটিলতায় জড়িত হন, তবে তার আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি থাকা উচিত। তা না হলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়।”

এখন সবার দৃষ্টি রয়েছে—আইসিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়ারেন্টের কপি প্রকাশ করবে কি না, ট্রাস্ট ব্যাংক আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবে কি না, এবং সর্বোপরি, সেনাবাহিনী এই বিতর্কিত ঘটনার সত্যতা প্রকাশ করবে কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত