প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন ধারাবাহিক হারের বৃত্তে আবদ্ধ, তখন দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মেহেদী হাসান মিরাজদের সামনে কেবল একটি জয় নয়—এটি এক ধরনের অস্তিত্বের লড়াই। ক্রিকেটারদের দক্ষতা নয়, আজ প্রশ্ন হচ্ছে—তারা কি ভক্তদের বিশ্বাস রক্ষা করতে পারবেন?
লঙ্কান মাটিতে বাংলাদেশের ইতিহাস বরাবরই হতাশার। ২০০২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সাতটি ওয়ানডে সিরিজ খেলেও একটিতেও জয় পায়নি টাইগাররা। একমাত্র সান্ত্বনা হিসেবে রয়েছে মাত্র দুটি ড্র—২০১৩ ও ২০১৭ সালে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের এই সফরে নতুন করে স্বপ্ন দেখছিল দলটি। কিন্তু সিরিজের প্রথম ম্যাচে মাত্র পাঁচ রানের ব্যবধানে হারের পর সে স্বপ্নে ছাই পড়ে।
প্রথম ম্যাচে চিত্রনাট্যটা যেন সিনেমার চেয়েও বেশি নাটকীয়। ১১০ রানে ০ উইকেট থেকে হঠাৎই ধস নামা শুরু—মাত্র ৭ রানের ব্যবধানে হারিয়ে যায় সাতটি উইকেট। রান তাড়ায় এমন ভঙ্গুর ব্যাটিং পারফরম্যান্স স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে দলের মানসিক দৃঢ়তা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা নিয়ে। ম্যাচের পর তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম অকপট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, “আমি দলের চাহিদা পূরণ করতে পারিনি। ভালো খেললে দল জিততো। তবে এখনো সুযোগ আছে ঘুরে দাঁড়ানোর।”
তামিমের মতে, ব্যাটিং বিপর্যয়ের মূল টার্নিং পয়েন্ট ছিল শান্তর রানআউট। সেই সময় তারা দু’জন যদি ৩০-৪০ রান যোগ করতে পারতেন, তবে চিত্র ভিন্ন হতে পারতো। তবে তিনি আত্মবিশ্বাসী যে, দলের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে এবং আজকের ম্যাচে পরিকল্পনা আরও বাস্তবমুখী। বিশেষ করে তিনি বললেন, “এই উইকেটে যিনি সেট হবেন, তাঁকে লম্বা ইনিংস খেলতেই হবে। এটা এখন একটা দায়, কেবল সুযোগ নয়।”
বাংলাদেশ দলের সাম্প্রতিক রেকর্ডও খুব একটা সাহস জোগায় না। ২০২৩ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের পর গত এক বছরে নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পরপর তিনটি সিরিজ হেরেছে দলটি। প্রতিপক্ষের মাঠে জয় তো দূরের কথা, সম্মানজনক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে প্রেমাদাসার দ্বিতীয় ওয়ানডেটি হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অগ্নিপরীক্ষা। শুধু সিরিজে টিকে থাকার লড়াই নয়, এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতি থাকা দেশবাসীর নড়বড়ে বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার এক মরিয়া প্রয়াস। আর এই ম্যাচে দলে কিছু পরিবর্তনের আভাসও মিলেছে।
প্রথম ম্যাচে জ্বরের কারণে খেলতে না পারা তরুণ লেগস্পিন অলরাউন্ডার রিশাদ হোসেন এখন পুরোপুরি ফিট এবং দ্বিতীয় ম্যাচে তার খেলা অনেকটাই নিশ্চিত। তার অন্তর্ভুক্তিতে একাদশ থেকে বাদ পড়তে পারেন তানভীর ইসলাম। যদিও তানভীরও ফিট, তবুও ম্যাচের কন্ডিশন বিবেচনায় রিশাদকেই এগিয়ে রাখছে টিম ম্যানেজমেন্ট।
এছাড়া পেসার মোস্তাফিজুর রহমান ম্যাচ ফিট হলেও তাকে নিয়ে রয়েছে সংশয়। প্রথম ম্যাচে স্পিনারের ঘাটতিতে পার্টটাইম বোলার নাজমুল হোসেন শান্তকে দিয়ে বল করাতে হয়েছিল। তিনি চার ওভারে একটি উইকেটও তুলে নেন। প্রেমাদাসার ধীর গতি উইকেট বিবেচনায় এবার হয়তো তিন স্পিনার নিয়ে মাঠে নামতে পারে বাংলাদেশ। এ পরিস্থিতিতে মোস্তাফিজের পরিবর্তে আরও একজন স্পিনারকে খেলানোর চিন্তা করছে টিম ম্যানেজমেন্ট।
বাংলাদেশ দল এখন এক কঠিন সময় পার করছে—জয়ের চেয়ে বড় প্রয়োজন বিশ্বাস ফিরে পাওয়া। সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানো, নিজেদের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং দীর্ঘদিনের হতাশার পর শ্রীলঙ্কার মাটিতে প্রথম সিরিজ জয়ের স্বপ্ন জিইয়ে রাখার জন্য আজকের ম্যাচটাই হয়ে উঠতে পারে টার্নিং পয়েন্ট।
ভবিষ্যতের ক্রিকেট ইতিহাসে এই ম্যাচের ফলাফল হয়তো একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে, কিন্তু টাইগারদের জন্য এটি সম্মানের লড়াই, আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার যুদ্ধ—একটি হারানো বিশ্বাসের পুনর্জন্মের গল্প। আজ সেই গল্পের সূচনা হবে কিনা, সেটিই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।