প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে ফরিদপুর জেলা বিএনপির সাম্প্রতিক কমিটি ঘোষণা। জেলার তিনটি উপজেলা ও পৌর কমিটির নবঘোষিত তালিকায় পাওয়া গেছে এমন এক বিস্ময়কর তথ্য, যা দেশের রাজনৈতিক মহলকে হতবাক করে দিয়েছে। ঘোষিত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা, যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। শুধু তাই নয়, দলটির অঙ্গসংগঠনের আরও ১২ জন সক্রিয় কর্মী এবং আলোচিত সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদের প্রাক্তন ক্যাশিয়ার মিজানুর রহমান সোনা মিয়াও বিএনপির নেতৃত্বে স্থান পেয়েছেন। এ তথ্য প্রকাশের পর থেকেই ফরিদপুরজুড়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তোলপাড়, ক্ষোভ, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী উপজেলার নতুন বিএনপি কমিটিগুলোতে এমন বহু ব্যক্তির নাম এসেছে, যাদের অতীতে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল। কেউ কেউ ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, কেউবা উপজেলা বা পৌর আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় পদে। অথচ এই নামগুলো যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিএনপির আনুষ্ঠানিক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আলফাডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটিতে সবচেয়ে আলোচিত নাম মিয়া আসাদুজ্জামান আসাদ মাস্টার। তিনি বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। অথচ এবার বিএনপির কমিটিতে তিনি সহসভাপতির পদ পেয়েছেন। একই কমিটিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য আবদুল ওহাব পান্নু হয়েছেন উপজেলা বিএনপির ৫ নম্বর সহসভাপতি। কৃষক লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মাসুদ মাস্টার হয়েছেন বিএনপির সহসভাপতি পদপ্রার্থী, যার নাম তালিকার চতুর্থ স্থানে।
আরেক বিতর্কিত নাম মনিরুজ্জামান মনির, যিনি গত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুর রহমানের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তাকেও উপজেলা বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। যুবলীগের প্রচার সম্পাদক মো. জাকার মেম্বারকে সহসমবায় সম্পাদক করা হয়েছে, আর কৃষক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওহিদ শিকদার মেম্বারকে সহসাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আলফাডাঙ্গা পৌর বিএনপির ১০১ সদস্যের কমিটিতে স্থান পেয়েছেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য কামরুজ্জামান কদর, যিনি আগে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি ছিলেন। আরো আশ্চর্যের বিষয়, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার শ্যালক নুরুল ইসলাম লিটনকেও উপজেলা বিএনপির সদস্য করা হয়েছে।
বোয়ালমারী উপজেলাতেও দেখা গেছে একই ধরনের চিত্র। সেখানে অমিত সাহা নামে এক ব্যক্তি, যিনি অতীতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাকে উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে এই নিয়োগ নিয়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, “আওয়ামী ঘনিষ্ঠ পরিবার ও প্রভাবশালী নেতার আত্মীয় বিএনপির অর্থ বিষয়ক পদে কীভাবে স্থান পেলেন?”
দাদপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলা বিশ্বাস ও যুবলীগের সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম বকুলকেও উপজেলা বিএনপির সদস্য করা হয়েছে। এই তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন-অর-রশিদের ক্যাশিয়ার মিজানুর রহমান সোনা মিয়া, যিনি এখন উপজেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য।
এমনকি উপজেলা শ্রমিক লীগের সহসভাপতি হরেন কুমার কৃষ্ণকেও পৌর বিএনপির ৭৩ নম্বর সদস্য করা হয়েছে, আর যুবলীগের সাবেক সদস্য গোপাল সাহা হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সহ-কোষাধ্যক্ষ।
মধুখালী উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটিতেও একই রকম ঘটনা। সেখানে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগম কৃকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ফ্যাসিবাদী আমলে আওয়ামী মনোনীত পৌর মহিলা কাউন্সিলর নাজমা সুলতানাকে করা হয়েছে উপজেলা বিএনপির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক। একই কমিটিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত মিলন মোল্লা হয়েছেন সহদপ্তর সম্পাদক, আর রায়হান মোল্লাকে দেওয়া হয়েছে পৌর বিএনপির কোষাধ্যক্ষ পদ।
এভাবে ফরিদপুরের তিনটি উপজেলা ও পৌর বিএনপির নবগঠিত কমিটিতে অন্তত ত্রিশজন ব্যক্তি এমন আছেন, যাদের রাজনৈতিক অতীত আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই নিয়োগের পর থেকেই ফরিদপুর জুড়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বিএনপির ত্যাগী ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। দীর্ঘদিন ধরে দলীয় আন্দোলনে সক্রিয় থাকা কর্মীরা বলছেন, তারা ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করেছেন, মামলার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু তবুও তাদের পুরস্কৃত করা হয়নি। বরং আওয়ামী ঘনিষ্ঠ বা প্রশাসনিক প্রভাবশালীদেরই পুরস্কৃত করা হচ্ছে।
বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা ইতিমধ্যে প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন ও মশাল মিছিল করেছেন। তাদের অভিযোগ, নতুন কমিটি গঠনে জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কিছু প্রভাবশালী নেতা স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনে জড়িত। ফলে মাঠপর্যায়ের পরিশ্রমী কর্মীরা উপেক্ষিত হচ্ছেন, আর দলে ঢুকে পড়ছেন সুবিধাবাদীরা।
বিএনপির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে দলীয় সূত্র জানায়, নতুন কমিটি অনুমোদনের স্বাক্ষরের নিচে লেখা ছিল—“নির্দেশিত হয়ে এই কমিটি অনুমোদন করা হইল।” এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, কমিটি গঠনে কেন্দ্রীয় দিকনির্দেশনা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই-বাছাই যথাযথভাবে হয়নি।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ কে কিবরিয়া স্বপন বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “সেন্ট্রাল থেকে কমিটির তালিকা ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, তাই আমরা বিস্তারিত যাচাইয়ের সময় পাইনি। যদি কেউ প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকে বা থেকে থাকে, তাহলে প্রমাণ পাওয়া মাত্রই তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।”
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি বর্তমানে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি দল পুনরায় সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এমন বিতর্কিত ও পরস্পরবিরোধী নিয়োগ দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে। এতে শুধু ত্যাগী নেতাদের হতাশা নয়, সাধারণ সমর্থকদের মধ্যেও বিভ্রান্তি বাড়বে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থী রাজনীতিকদের বিএনপিতে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কিছু মহলে নতুন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারবিরোধী অবস্থান জোরদার করতে বিএনপি কৌশলগতভাবে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দলে টানছে। তবে এতে আদর্শিক দুর্বলতা ও নৈতিক বিভাজন আরও গভীর হতে পারে বলেও বিশ্লেষকদের মত।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত অবস্থান ও সুযোগের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। ফরিদপুরের এই ঘটনাই যেন সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। একদলীয় শাসনের সমালোচকরা বলছেন, এই ধরনের সাংগঠনিক বিভ্রান্তি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমিয়ে দেবে।
বিএনপির এই বিতর্কিত কমিটি ঘোষণার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন সারা জেলায় শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। দলীয় অভ্যন্তরে ক্ষোভ দমন করতে না পারলে এই বিতর্ক বড় ধরনের সাংগঠনিক সঙ্কটে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন ফরিদপুরের রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।