গাইবান্ধায় গরু চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে তিনজনের মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৩ বার
গাইবান্ধায় গরু চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে তিনজনের মৃত্যু

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে গরু চুরির অভিযোগে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে গণপিটুনিতে। শনিবার (২ নভেম্বর) গভীর রাতে উপজেলার একটি মাজার সংলগ্ন এলাকায় এ নির্মম ঘটনা ঘটে। রাতের নীরবতা ভেদ করে চুরির চেষ্টার সময় স্থানীয়রা চোর সন্দেহে তাদের আটক করে বেধড়ক মারধর করলে ঘটনাস্থলেই দুইজন প্রাণ হারান। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজনের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি গোটা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়রা জানান, রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে গ্রামের এক বাসিন্দার গোয়ালঘরে ঢুকে একটি সংঘবদ্ধ দল। তারা গরুগুলো পিকআপ ভ্যানে তোলার চেষ্টা করছিল। এমন সময় বাড়ির লোকজনের সন্দেহ হলে চোরদের উপস্থিতি টের পেয়ে যায় গ্রামবাসী। চোরেরা পালানোর চেষ্টা করলে গ্রামবাসী ধাওয়া দেয়। কেউ কেউ পাশের জঙ্গলে লুকানোর চেষ্টা করে, আবার কেউ পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে তারা। মুহূর্তেই উত্তেজিত জনতা বেধড়ক মারধর শুরু করে। ঘটনাস্থলেই দুজন মারা যান এবং আরেকজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মৃত্যুবরণ করেন।

ঘটনার খবর দ্রুতই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। রাতের সেই ভীতিকর মুহূর্তের সাক্ষী গ্রামবাসী আজও শিহরিত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গ্রামটিতে সম্প্রতি গবাদিপশু চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ জমে ছিল। কয়েকদিন আগেই একই এলাকায় একটি গরু চুরির ঘটনা ঘটেছিল, কিন্তু চোরেরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই স্থানীয়রা রাতে পাহারা দিচ্ছিল। তাই এ ঘটনার সময় তারা এক মুহূর্ত দেরি না করেই চোর সন্দেহে লোকগুলোকে ধরে ফেলে।

পুলিশ খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে যায়। গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম জানান, নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় আনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহগুলো গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হবে। তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।

এদিকে, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন গাইবান্ধা জেলার পুলিশ সুপার নিশাত অ্যাঞ্জেলা। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এ ধরনের গণপিটুনি কোনোভাবেই আইনসঙ্গত নয়। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার আইনের মাধ্যমে হওয়া উচিত। আমরা ঘটনাটিকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, “গ্রামবাসী দীর্ঘদিন ধরে গরু চোরদের ভয়ে আতঙ্কে ছিল। গত কয়েক মাসে অন্তত তিনবার গবাদিপশু চুরির ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে জনরোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মানুষ আর ধৈর্য রাখতে পারেনি। তবে আইনের বাইরে গিয়ে এমন কাজ কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়।”

অন্যদিকে, নিহতদের পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়স্বজন এখনো কেউ এসে পরিচয় নিশ্চিত করেননি। পুলিশ আশেপাশের থানাগুলোতে যোগাযোগ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। এলাকাবাসীর কেউ কেউ ধারণা করছেন, নিহতরা পার্শ্ববর্তী জেলার বাসিন্দা হতে পারেন।

ঘটনাটি গোটা এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা চুরির ভোগান্তিতে ক্ষুব্ধ হয়ে মানুষ এমন কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। আবার অনেকে বলছেন, আইনের প্রতি আস্থা হারালে সমাজে অরাজকতা বাড়বে। মানবাধিকারের সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি তুলেছে।

আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত পিকআপ ভ্যানটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এতে কিছু দড়ি, গরু বেঁধে রাখার সরঞ্জাম এবং মোবাইল ফোনের একটি সেট উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, এটি একটি সংঘবদ্ধ গরু চোর চক্রের অংশ হতে পারে, যারা বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশু চুরি করে পাচার করত।

স্থানীয়রা এখনো ভয় ও অনুতাপে ভুগছেন। এক বাসিন্দা বলেন, “সত্যি বলতে, আমরা তখন খুব রাগে ছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, হয়তো একটু বেশি হয়ে গেছে। আইন নিজের হাতে নেওয়া ঠিক হয়নি।”

গোবিন্দগঞ্জের এই ঘটনাটি আবারও সমাজে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রশাসন একদিকে যেমন চুরি ও অপরাধ দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে জনগণকেও আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে আহ্বান জানিয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, তদন্ত শেষে এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে আসল কারণ কতটা স্পষ্টভাবে উঠে আসে এবং বিচার কীভাবে হয়। তবে আপাতত গাইবান্ধার ছোট্ট গ্রামটি এখনো রক্তাক্ত সেই রাতের স্মৃতি আর আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত