প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আরও এক মাসের জন্য বাড়ানো হয়েছে। সাম্প্রতিক ‘নোটিস টু এয়ারমেন’ বা নোটাম জারির মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২০২৬ সালের ২৪ মে ভোর ৫টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভারতীয় নিবন্ধিত, লিজ নেওয়া, বাণিজ্যিক ও সামরিক সব ধরনের উড়োজাহাজ পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না। গত বছরের ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা ইতোমধ্যে এক বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের ফলে ভারতের বিমান সংস্থাগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক রুট পরিবর্তন করতে হওয়ায় জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি, সময় বৃদ্ধি এবং ফ্লাইট পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এতে ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলোর কয়েক বিলিয়ন রুপির ক্ষতি হয়েছে।
এই আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞার পেছনে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা। কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলার ঘটনার পর ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই ঘটনার পর ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তান ভারতীয় বিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।
ভারত ওই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করলেও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানায়। উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় ৩০ এপ্রিল ভারতও পাকিস্তানি উড়োজাহাজের জন্য নিজস্ব আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়, ফলে দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচলে পারস্পরিক নিষেধাজ্ঞা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় ২০২৫ সালের মে মাসে, যখন সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে। পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, ভারত প্রথমে একাধিক শহরে হামলা চালায়, যার জবাবে তারা ‘অপারেশন বুনইয়ানুম মারসুস’ নামে পাল্টা সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।
এই অভিযানে ভারতের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয় বলে দাবি করে ইসলামাবাদ। পাশাপাশি পাকিস্তান তিনটি রাফালসহ ভারতের সাতটি যুদ্ধবিমান ও বহু ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করে, যদিও ভারত এসব দাবির বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান জানায়।
প্রায় ৮৭ ঘণ্টার এই উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ মে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর সামরিক সংঘাত থামলেও রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞা শুধু রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হিসেবেও কাজ করছে। বিশেষ করে ভারতের দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলোকে অতিরিক্ত রুট ব্যবহার করতে হওয়ায় সময় ও ব্যয় উভয়ই বেড়ে গেছে।
এর আগে ১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘাত এবং ২০১৯ সালের পুলওয়ামা ঘটনার পরও পাকিস্তান আকাশসীমা বন্ধ করেছিল, যার প্রভাব তখনও ভারতের বিমান চলাচলে ব্যাপকভাবে পড়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিমান পরিবহন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে আকাশসীমা বন্ধ থাকলে শুধু এয়ারলাইন্স নয়, পর্যটন ও বাণিজ্য খাতেও পরোক্ষভাবে প্রভাব পড়ে।
এদিকে পাকিস্তান বলছে, তাদের আকাশসীমা নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিবেচনার ওপর ভিত্তি করেই বন্ধ রাখা হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে চলমান এই উত্তেজনা দক্ষিণ এশিয়ার আকাশপথ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।