৫ কোটি ৩২ লাখ টাকার মামলায় কৃষি কর্মকর্তা গ্রেফতার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪০ বার
৫ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক কৃষি কর্মকর্তা গ্রেফতার

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের কৃষি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আবারও বড় ধরনের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সাবেক সহকারী পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ শরীফুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে ৫ কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি সরকারি অর্থ আত্মসাতের মামলায়। অভিযোগ, সরকারিভাবে বরাদ্দ করা বিশেষ প্রকল্পের অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয় দেখিয়ে তা দীর্ঘ সময় ধরে আত্মসাৎ করেছেন তিনি।

দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে মঙ্গলবার দুপুরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। দুদক সূত্র জানায়, গ্রেফতার হওয়া কর্মকর্তা দীর্ঘদিন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অর্থ শাখায় কর্মরত ছিলেন। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন উপ-প্রকল্প, উপজেলা কৃষি অফিস এবং হর্টিকালচার সেন্টারের নামে বরাদ্দ দেওয়া কোটি কোটি টাকা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে আত্মসাৎ করেন।

তদন্তে দেখা যায়, বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর বড় অংশেই প্রকৃত খরচ হয়নি। কোথাও ক্রয়ের রেকর্ড নেই, কোথাও আবার কার্যক্রমের প্রমাণ নেই। অথচ পুরো অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে সরকারি নথিতে। এমনকি যেসব কর্মকর্তার অনুমোদন থাকা জরুরি ছিল, তাদের সাক্ষর বা অনুমোদন ছাড়াই অর্থ ছাড় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি ব্যয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের অংশ হিসেবে একাধিক পর্যায়ে অডিট ও তথ্য সংগ্রহের পর এই অনিয়ম ধরা পড়ে। অডিট রিপোর্টে বলা হয়, প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ ছিল কৃষি সরঞ্জাম, বীজ সরবরাহ, কৃষি প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে। কিন্তু বাস্তবে মাঠপর্যায়ে এসব কর্মকাণ্ডের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বরং নথি জালিয়াতি করে এসব অর্থ নিজের দখলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে প্রাথমিক তদন্তেই।

দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশের কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের অপব্যবহার দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তদন্ত করে দেখা গেছে, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত লাভের আশায় এত বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এটা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, কৃষকের অধিকার হরণ।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই মামলার তদন্তে আরও কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দুদক নিশ্চিত করেছে। একটি উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান টিম ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নথিপত্র ও ডিজিটাল ডেটা সংগ্রহ করেছে।

কৃষি খাতের সঙ্গে জড়িত অনেকেই এই ঘটনার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, দেশের কৃষি খাত এখনো সরকারি সহায়তা, সেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি বরাদ্দই কৃষকের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা ছোট খাটো বরাদ্দ পেতে সংগ্রাম করেন, সেখানে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ কেউ ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করবে—এটা কল্পনার বাইরে।

এ বিষয়ে এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “হর্টিকালচার কেন্দ্র বা উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ পাওয়া মানে সেখানকার কৃষকদের জন্য বড় সুযোগ। এমন টাকা আত্মসাৎ মানে কয়েকশো কৃষক তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেন। এটা শুধু অর্থ নয়, উন্নয়ন কার্যক্রমকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।”

স্থানীয় কৃষকেরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হলে তাদের কৃষিকাজে আধুনিক সরঞ্জাম, মানসম্মত বীজ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা পাওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু কিছু দুর্নীতিবাজের কারণে এসব উদ্যোগ ব্যাহত হয়। একজন কৃষক বলেন, “আমরা শুনেছিলাম আমাদের এলাকায় নতুন প্রকল্প আসছে। কিন্তু কোনো কাজই দেখিনি। এখন বুঝতে পারছি সেই টাকার কি হয়েছে।”

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এমন ঘটনার শাস্তি দ্রুত না হলে সরকারি খাত থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা কঠিন হবে। দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতের মতো কৃষিতেও বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ হয়। এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হলে দেশের কৃষির সম্ভাবনা আরও বাড়ে, কৃষকের জীবনমান উন্নত হয়। তাই বরাদ্দের অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সরকারি পর্যায়ে ইতোমধ্যেই বলা হয়েছে, কৃষি খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতি ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করা হবে। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যে কেউ অনিয়মে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অপরাধীরা কতটা ক্ষমতাধরই হোক, বিচারের বাইরে থাকবে না—এ কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন কর্মকর্তারা। পাশাপাশি কৃষি উন্নয়ন অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নতুন করে মনিটরিং ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে।

এই গ্রেফতারের ঘটনা শুধু একটি মামলার অংশ নয়—এটি দেশের কৃষি খাতকে দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাখতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। আদালতে মামলার কার্যক্রম চলবে এবং দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দেশের অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই খাতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা ও প্রতিটি বরাদ্দের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জাতীয় দায়বদ্ধতার বিষয়। এই গ্রেফতার দেশের জনগণের কাছে আশার বার্তা দিয়েছে যে, দুর্নীতি করে কেউ শেষ পর্যন্ত পার পাবে না।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অভিযানের মধ্য দিয়ে কৃষি প্রশাসনে একটি ইতিবাচক বার্তা গেছে—জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আর সাধারণ নাগরিকেরা এই বার্তাই আশা করেন: রাষ্ট্রের অর্থ রাষ্ট্রের কাজে লাগবে, ব্যক্তিগত লাভে নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত