প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর বুধবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রায় ৯ মাস আগে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ভাঙচুরের ঘটনায় যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক পরিসরে নতুন এক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার দ্রুত একটি বিবৃতি জারি করে। তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযোগ ছিল, ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমাগত উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে চাইছেন। পাশাপাশি তারা ভারতের প্রতি অনুরোধ জানায়, তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হোক। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকেও তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়।
এরপরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাল্টা বিবৃতি দেয়। সেখানে বলা হয়, শেখ হাসিনা যা বলছেন তা ব্যক্তিগত হিসেবে বলছেন, ভারতের সরকারের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ভারতের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয় যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়কে ভারতকে দায়ী করা বা নেতিবাচক দৃষ্টিতে তুলে ধরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য উপযুক্ত হবে না। এর প্রেক্ষিতে ঢাকায় ভারতের উচ্চকমিশনারকেও তলব করা হয়।
গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ভারতের আশ্রয় ও আতিথেয়তায় থাকা শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে। এটি ছিল নজিরবিহীন। বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথাবার্তাও হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই গণহত্যায় অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে। এটি ভালোই হতে পারে, তবে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য বাংলাদেশ হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে। কিন্তু এখন যদি ভারত তাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেয়, এবং তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের উসকানি দিয়ে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চান, তাহলে তা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
দুই দেশের সম্পর্কের এই সূক্ষ্ম সমীকরণটি শুধু কূটনৈতিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবে ও সামাজিকভাবেও প্রভাব ফেলে। শেখ হাসিনার অবস্থান, ভারতের তার ওপর কৌশল এবং বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া—এই তিনটি উপাদান মিলে তৈরি করছে একটি জটিল পরিস্থিতি। এর মধ্যে বাংলাদেশ আশা করছে, ভারতের শৃঙ্খলাবদ্ধ আচরণ এবং চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় থাকবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্নয়নশীল হলেও, রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে কোনো তাড়াহুড়ো বা প্রকাশ্যে সমাধান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম বিষয় হলো, শেখ হাসিনাকে যদি কোনো ধরণের প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হয়, তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
সামাজিক দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বাইরে থাকা একজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, যা সাধারণ জনগণ ও প্রশাসন দু’পক্ষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারণেই কূটনৈতিকভাবে দুই দেশের মধ্যে সংবেদনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি পরিচালনা করা হচ্ছে।
উপসংহারে, ভারতের ধীরে ধীরে ‘আনলক’ নীতি শুধু শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি দুই দেশের সম্পর্কের সূক্ষ্মতার প্রতিফলনও বহন করছে। ঢাকা ও দিল্লি দু’পক্ষই সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। “একটি বাংলাদেশ অনলাইন” পাঠকদের জন্য এই ঘটনা বিশদভাবে ও নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করেছে।