সর্বমিত্র চাকমা মাদক কারবারিকে লাঠি দিয়ে শাসন করায় সমালোচনার মুখে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
সর্বমিত্র চাকমা মাদক কারবারিকে লাঠি দিয়ে শাসন করায় সমালোচনার মুখে

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সদস্য সর্বমিত্র চাকমা গভীর রাতের সময় ক্যাম্পাসে ‘মাদক কারবারি’র অভিযোগে এক বৃদ্ধকে লাঠি হাতে শাসানোর ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সোমবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে শহীদুল্লাহ হলের সামনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, ‘প্রক্টরিয়াল বডি’ লেখা জ্যাকেট পরা এক নিরাপত্তাকর্মী বৃদ্ধকে লাঠি দিয়ে শাসাচ্ছেন। বৃদ্ধ ব্যক্তি হাতের ব্যাগ দিয়ে লাঠির আঘাত প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। ভিডিওতে পাশে দাঁড়িয়ে ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন এবং লাঠি হাতে উপস্থিত থাকার দৃশ্যও ধরা পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের প্রধান ইউসুফ হারুন নিশ্চিত করেছেন যে ঘটনাস্থলে সর্বমিত্র ছাড়াও প্রক্টর অফিসের তিনজন নিরাপত্তাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, “ওই সময় আমাদের প্রক্টর অফিসের তিনজন স্টাফও উপস্থিত ছিলেন।”

সর্বমিত্র চাকমার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি স্বীকার করেছেন যে, বৃদ্ধকে তাড়ানোর সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং ‘লাঠি হাতে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না’ বলে মন্তব্য করেছেন। সর্বমিত্র লিখেছেন, “যে বৃদ্ধকে দেখেছেন, আমি শুরু থেকে প্রতিরাতে তাকে মেট্রো স্টেশন থেকে ক্যাম্পাসে আসা আটকাচ্ছি। সেই ব্যক্তির সঙ্গে আরও একজন বৃদ্ধ রয়েছে, যিনি মাদকাসক্ত। এর আগে তাদের কাছ থেকে গাঁজা পাওয়া গিয়েছিল।”

তিনি আরও জানান, “এই ব্যক্তিদের সরানো অত্যন্ত কঠিন। এগুলো ৪–৫ কদম এগোয় এবং তাই লাঠিসোটা ছাড়া তাদের সরানো সম্ভব নয়। আমার কোনো স্বার্থসিদ্ধি নেই, আমি শুধু আমার ক্যাম্পাসকে ভবঘুরে, পাগল ও গাঁজাখোর মুক্ত দেখতে চেয়েছি।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে যে, একজন ডাকসু সদস্য হিসেবে সর্বমিত্রের এই ভূমিকা কি প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অনেকেই এই ঘটনায় ‘মোরাল পুলিশিং’ এবং ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ উল্লেখ করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ বলেন, “অভিযানে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। সর্বমিত্র যা করেছেন, তা হয়তো উদবাস্তু এবং মাদক কারবারিদের সরানোর জন্য ভয় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। তিনি শরীরে আঘাত করেননি। তবে ডাকসু সদস্য যে পদ্ধতিতে একশন নিয়েছেন, সেটি রীতিসিদ্ধ ছিল না। যদি কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসে, আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব।”

সর্বমিত্র চাকমা শুধু এই ঘটনার জন্যই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই। সম্প্রতি তিনি আরও এক বিতর্কে জড়িয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ডাকসু নির্বাচনের সাবেক প্রার্থী আবির হাসান অভিযোগ করেন, সর্বমিত্র প্রক্টর অফিসে উপস্থিত অবস্থায় বামপন্থী শিক্ষার্থীদের ‘মেরে ঠ্যাং ভেঙে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন।

ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে আবির লিখেছেন, “যেদিন প্রক্টর অফিসে আমার ফোন চেক করা হয়, তখন বামপন্থীরা হকারদের সঙ্গে মিছিল করছিল। এই সময় সর্বমিত্র চাকমা রুমে ঢুকে বললেন, ‘আপনি শুধু অনুমতি দিন, আমি হলপাড়া থেকে ১০ জন পোলাপান নিয়ে তাদের মেরে ঠ্যাং ভেঙে দিয়ে আসি।’ আমি তখন ভেতরে থেকে বলেছিলাম, ‘ছোটভাই, তোমার হল যেন কোনটা? নিজের হল থেকে দুইজন পোলাপান নিয়ে আসো তো, দেখি।’”

বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাজিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সর্বমিত্র চাকমার কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই বিষয়ে বলেছে যে, ঘটনা তদন্তের পর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব প্রশ্ন করছেন, ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের এই ধরনের পদক্ষেপ কি সংবিধান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা বজায় রাখার দায়িত্ব মূলত প্রশাসনের, ছাত্র সংগঠকের নয়।

সর্বমিত্র চাকমার বক্তব্য ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে, ক্যাম্পাসে নীতি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মাদকমুক্ত পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য থেকে ব্যক্তিগত ক্ষমতার প্রয়োগ ও বিতর্কিত পদক্ষেপের মধ্যে সরল রেখা বজায় রাখা কতটা জটিল। এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রসংগঠন উভয়ই সতর্ক হয়ে উঠেছে।

অভিজ্ঞরা মনে করছেন, ক্যাম্পাসে সামাজিক ও মানবিক দিক বিবেচনা করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইন ও নৈতিকতার প্রতি সচেতনতা তৈরি করা ছাড়াও, প্রশাসনিক সহায়তা ছাড়া কোনো ছাত্রসংগঠন সদস্যের একক পদক্ষেপ সংবিধানিক ও নৈতিকভাবে বিতর্কিত হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কেন্দ্রীয় স্থান হিসেবে শহীদুল্লাহ হলের সামনে এই ঘটনা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার্থী জীবনের সংবেদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলোকে সামনে এনেছে। সামাজিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে এই ঘটনার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার বিষয় হতে পারে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত