প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অপহরণের এক নাটকীয় ঘটনার পর শেষ পর্যন্ত জীবিত উদ্ধার হয়েছেন তিন ব্যক্তি। কাজের প্রলোভনে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। টানা কয়েকদিনের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর পরিবারের উদ্বেগের অবসান ঘটে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র্যাব-১৫ এর অভিযানে।
ঘটনাটি ঘটে টেকনাফ-এর একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়, যেখানে অপহৃতদের জিম্মি করে রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতের অভিযানে অপহৃত তিনজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অভিযানের উপস্থিতি টের পেয়ে অপহরণকারীরা পালিয়ে যায়।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন জাকির আহাম্মদ (৪২), নুর হোসেন (২২) এবং আয়াত উল্যাহ (২২)। তাদের বাড়ি কক্সবাজার সদর উপজেলার লিংক রোড দক্ষিণ মুহুরী পাড়া এলাকায়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন ধরে তাদের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিল।
র্যাব জানায়, গত ১০ এপ্রিল দুপুরে একটি অজ্ঞাত চক্র রাজমিস্ত্রির কাজ দেওয়ার কথা বলে এই তিনজনকে টেকনাফ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ডেকে নেয়। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ হিসেবে কাজের সুযোগের আশায় তারা সেখানে যান। কিন্তু সেটিই হয়ে ওঠে তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শুরু। বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজি অটোরিকশায় করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় সদর ইউনিয়নের রাজারছড়া এলাকার করাচি পাড়ার গভীর পাহাড়ি অঞ্চলে।
সেখানে পৌঁছে তাদের জিম্মি করে রাখা হয় এবং পরিবারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। অপহরণকারীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরিবারের সদস্যরা জানান, ফোনের ওপাশে প্রিয়জনদের কণ্ঠ শুনে তারা বুঝতে পারেন পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর এবং সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।
এই ঘটনার পর ১২ এপ্রিল ভুক্তভোগীদের পরিবার কক্সবাজার সদর মডেল থানা-তে দুটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে বিষয়টি র্যাবকে জানানো হলে সংস্থাটি দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠে। গোয়েন্দা নজরদারি এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অপহরণকারীদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা শুরু হয়।
র্যাব-১৫, সিপিসি-১ টেকনাফ ক্যাম্পের একটি বিশেষ দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ১৬ এপ্রিল রাতে অভিযান পরিচালনা করে। রাত ৯টা ১০ মিনিটের দিকে করাচি পাড়া সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকা এবং হ্নীলা বাজারে একযোগে অভিযান চালানো হয়। পাহাড়ি এলাকার প্রতিকূল পরিবেশ, আঁকাবাঁকা পথ এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি সত্ত্বেও বাহিনী অভিযান চালিয়ে যায়।
অভিযানের এক পর্যায়ে র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে অপহরণকারীরা দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। তারা অপহৃত তিনজনকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপের মুখে তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। পরে র্যাব সদস্যরা ওই স্থান থেকে তিনজনকে উদ্ধার করেন।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থা প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল বলে জানা গেছে, তবে মানসিকভাবে তারা ভীষণভাবে আতঙ্কিত ছিলেন। কয়েকদিনের বন্দিদশা, ভয় এবং অনিশ্চয়তা তাদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। র্যাব জানিয়েছে, তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পালিয়ে যাওয়া অপহরণকারীদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে এই চক্রের পেছনে আর কেউ জড়িত আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। র্যাবের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এটি একটি সংগঠিত চক্র, যারা পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জিং পরিবেশের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সেখানে আশ্রয় নেয়। ফলে এই ধরনের ঘটনা মাঝে মধ্যেই ঘটছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের অপহরণ চক্র দমনে শুধু অভিযানই যথেষ্ট নয়, বরং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষদের কাজের প্রলোভনে কোথাও যাওয়ার আগে যাচাই-বাছাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। জীবিকার সন্ধানে বের হওয়া তিনজন মানুষ হঠাৎ করেই অপহরণের শিকার হন, যা তাদের পরিবারের জন্য এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা তৈরি করে। তাদের নিরাপদে ফিরে আসা যেমন স্বস্তির, তেমনি এই ঘটনা ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হওয়ার একটি বার্তাও বহন করে।
সব মিলিয়ে, টেকনাফের এই অপহরণ ও উদ্ধার অভিযান আবারও প্রমাণ করেছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ অনেক বড় বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তা—যে কোনো প্রলোভন বা সন্দেহজনক প্রস্তাব গ্রহণের আগে প্রয়োজন যথাযথ সতর্কতা এবং সচেতনতা।