প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের পুনরায় শুনানি দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ নজর কেড়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চে নবম দিনের শুনানি শুরু হয়। এ মামলা মূলত ২০১১ সালের আপিল বিভাগের রায় এবং ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর সঙ্গে সংযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বৈধতা ও কার্যকারিতা নিয়ে।
মামলাটির ইতিহাস দীর্ঘ। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে পাশ হয়, যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে ১৯৯৮ সালে তিনজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন, যার পর হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানার পর রুল জারি করেন। ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট চূড়ান্তভাবে রিট খারিজ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বৈধ ঘোষণা করে। এরপর ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলা যায় এবং আদালত এ মামলায় বিভিন্ন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ করে মতামত গ্রহণ করে। পাঁচজন অ্যামিকাস কিউরি সরাসরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে এবং একজন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে মত দেন। ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেন। এ রায়ের পর ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ হয় এবং ৩ জুলাই গেজেট প্রকাশিত হয়।
নবম দিনের শুনানিতে আদালতে রিটকারী বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন, এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান শুনানি করেন। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আনার মাধ্যমে সাময়িক সমাধান দিতে চায় না। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা, যাতে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা বারবার বিঘ্নিত না হয় এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখে। তিনি এসময় প্রশ্ন তোলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরালে তা কখন থেকে কার্যকর হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে জানান, গত দেড় দশকে দেশের মানুষ বিভিন্নভাবে শোষিত হয়েছেন। মানুষ গুম, হত্যাসহ বিচার বহির্ভূত নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এই পরিস্থিতির ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে এবং জনগণের ক্ষমতা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন এবং বলেন, জনগণের এই ক্ষমতাকে কোনোভাবেই অবজ্ঞা করা যায় না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আপিল বিভাগের কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানোর জন্য পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। পরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার পৃথকভাবে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানান। এছাড়া নওগাঁর বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও একই ধরনের আবেদন করেন। এইভাবে মোট চারটি রিভিউ আবেদন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে।
প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালের আপিলের সময় আদালত ৮ জন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ করে তাদের মতামত গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে পাঁচজন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে এবং তিনজন বাতিল বা সংস্কারের পক্ষে মত দেন। এছাড়া তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দেন। ২০১১ সালের রায় অনুযায়ী সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল হয়, যার ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় সংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যকর করা হয়নি।
নবম দিনের শুনানি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালত একটি কার্যকর নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিঘ্নিত না হয় এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়। শুনানিতে উপস্থিত আইনজীবী ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে আদালত শীঘ্রই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারে। দেশের রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণ এই শুনানির দিকে লক্ষ্য রাখছে, কারণ এটি শুধুমাত্র একটি আইনগত বিষয় নয়, বরং জাতীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত এই আপিল শুনানি ভবিষ্যতে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, স্বতন্ত্রতা এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কার্যকর প্রশাসন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।