কঙ্গোয় ইবোলা আক্রান্ত ৯০০ ছাড়ালো, উদ্বেগ বাড়ছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ৫৫ বার
কঙ্গোয় ইবোলা আক্রান্ত ৯০০ ছাড়ালো, উদ্বেগ বাড়ছে

প্রকাশ: ২৫ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআরসি) পূর্বাঞ্চলে চলমান ইবোলা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৯০৪ জন এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণ নতুন করে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পরিস্থিতিকে কঙ্গোর জন্য “অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে সংস্থাটি বলছে, প্রাদুর্ভাবটি এখনো বৈশ্বিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। তারপরও স্থানীয় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি এবং নিয়ন্ত্রণহীন সংক্রমণ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে।

কঙ্গো সরকার ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নিলেও বাস্তব চিত্র বেশ জটিল। দেশের পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে ইতুরি প্রদেশে, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা, দীর্ঘদিনের সংঘাত এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রবেশই সম্ভব হচ্ছে না, ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে যখন ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা একাধিক চিকিৎসা কেন্দ্রে হামলা চালায়। ইবোলা চিকিৎসায় নিয়োজিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’-এর পরিচালিত একটি কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের সহিংসতা রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো।

ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল ইতুরি প্রদেশ দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। ইসলামিক স্টেট সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এবং রুয়ান্ডা-সমর্থিত এম২৩ বিদ্রোহীদের উপস্থিতির কারণে সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। এর ফলে প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যাদের বড় অংশই অস্থায়ী শিবিরে মানবেতর অবস্থায় বসবাস করছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর ভেতর দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ শিবির, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং পরিষ্কার পানির অভাব ইবোলা নিয়ন্ত্রণকে প্রায় অসম্ভব করে তুলছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস জানিয়েছে, এমন ভঙ্গুর পরিবেশে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

অন্যদিকে, স্থানীয় জনগণের মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যনীতি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর প্রতি অবিশ্বাসও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। অনেক এলাকায় ইবোলা রোগীর মৃতদেহ দাফন নিয়ে কঠোর নিয়ম আরোপ করায় স্থানীয় ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসা কার্যক্রমে সহযোগিতার বদলে প্রতিরোধ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, বৈশ্বিক সহায়তা কমে যাওয়াও কঙ্গোর জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নত দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা হ্রাস পাওয়ায় ইবোলা শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সময়মতো রোগ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, অনেক চিকিৎসাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম নেই। ফেস শিল্ড, প্রটেকটিভ স্যুট, টেস্ট কিট এবং নিরাপদ দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতি রয়েছে। কিছু এলাকায় কেবলমাত্র সীমিত মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া “বান্দিবুগিও” ধরনের ইবোলা ভাইরাসের জন্য এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ মূলত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং সংক্রমণ সীমিত রাখার ওপর নির্ভর করছে।

কঙ্গো সরকার ইতিমধ্যেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৫০ জনের বেশি মানুষের জমায়েত, শোকসভা এবং জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে। প্রশাসনের লক্ষ্য হলো সামাজিক সংস্পর্শ কমিয়ে ভাইরাসের সংক্রমণ চক্র ভাঙা। তবে নিরাপত্তা ও আস্থার সংকটের কারণে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা শুধু কঙ্গো নয়, গোটা অঞ্চলের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

সব মিলিয়ে কঙ্গোর ইবোলা পরিস্থিতি এখন একদিকে স্বাস্থ্য সংকট, অন্যদিকে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরছে। সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা কতটা কঠিন, তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com