প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ব্যাংক খাতের বহুল আলোচিত দুর্নীতির একটি মামলায় অবশেষে গ্রেফতার হলেন এক্সিম ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেন। প্রায় ৮৫৮ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ঋণ বিতরণে অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক শাহজাহান মিরাজের নেতৃত্বে একটি বিশেষ অভিযান দল এই গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করে।
দুদকের সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ‘মদিনা ডেটস অ্যান্ড নাটস’ নামের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে জামানতবিহীনভাবে বিশাল অঙ্কের ঋণ প্রদান করা হয়। সেই অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যাংক থেকে তুলে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত ১৭ আগস্ট দুদকের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বাদী হয়ে ফিরোজ হোসেনসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় বলা হয়, এক্সিম ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা ও পরিচালকের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে ওই প্রতিষ্ঠানকে ৮৫৮ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করা হয়, যা পরবর্তীতে আত্মসাতের মাধ্যমে পাচার করা হয়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের পণ্য আমদানি বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা না করেই ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করে। কোনো জামানত ছাড়াই এ ধরনের ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মদিনা ডেটস অ্যান্ড নাটস নামের প্রতিষ্ঠানটি মূলত কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে কোনো বড় ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল না। তবুও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যথাযথ যাচাই-বাছাই না করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে তা উপেক্ষা করে ঋণ অনুমোদন দেয়।
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে দেখা গেছে যে ঋণ বিতরণের নামে ব্যাংক থেকে টাকা তোলা হলেও তার কোনো অংশই ব্যবসায়িক খাতে ব্যবহার করা হয়নি। বরং অর্থের বড় একটি অংশ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর করে পরে আত্মসাত করা হয়। এই জালিয়াতির সঙ্গে ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্যরাও জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। দুর্নীতির এই কৌশলটি ছিল সুপরিকল্পিত, যেখানে মিথ্যা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলা, ভুয়া আমদানির কাগজপত্র দেখানো এবং আর্থিক প্রতিবেদনে জাল তথ্য উপস্থাপন—সবকিছুই নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “এই মামলাটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের ভয়াবহ উদাহরণ। এখানে শুধু ঋণ জালিয়াতি হয়নি, বরং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রভাবশালী মহলের চাপও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা তদন্তে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি, অনুমোদন প্রক্রিয়া, লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করছি। ফিরোজ হোসেন ছিলেন সেই সময় ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে, ফলে তার ভূমিকা এই অনিয়মে কতটা ছিল তা নির্ধারণ করাই এখন মূল লক্ষ্য।”
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এক্সিম ব্যাংকের কিছু পরিচালক এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রভাবের কারণে ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়মবহির্ভূতভাবে ত্বরান্বিত করা হয়। কোনো ধরনের জামানত বা সিকিউরিটি ছাড়াই এত বড় অঙ্কের ঋণ প্রদান বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে বিরল। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও নিরীক্ষা বিভাগ—দুইটিই এই ঋণ অনুমোদনের বিষয়ে আপত্তি জানালেও তা উপেক্ষা করা হয়।
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান অনিয়ম ও দায়মুক্ত সংস্কৃতির প্রতিফলন। অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, “ব্যাংক খাতে দায়বদ্ধতার অভাবই এই ধরনের জালিয়াতিকে উৎসাহিত করছে। যে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই না করে বা জামানত ছাড়াই ৮০০ কোটির বেশি টাকা ঋণ দেওয়া হয়, সেখানে স্পষ্টতই দুর্নীতির ইঙ্গিত রয়েছে।”
এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, ফিরোজ হোসেন অবসরের পর থেকেই দুদকের নজরদারিতে ছিলেন। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও প্রমাণ সংগ্রহের পর বৃহস্পতিবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে দুদক তার ব্যাংক হিসাব এবং সম্পদের ওপরও নজরদারি চালায়। এখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
অর্থ আত্মসাতের এই অভিযোগ শুধু ফিরোজ হোসেনের ব্যক্তিগত দায়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত আর্থিক চক্রের কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়। তদন্তে দেখা গেছে, একই ধরনের অনিয়ম আরও কিছু প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ঘটেছে, যেগুলোর সঙ্গে এই চক্রের সদস্যদের যোগসূত্র রয়েছে। দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, ফিরোজ হোসেনের জবানবন্দি থেকে এই চক্রের অন্যান্য সদস্যদের নামও জানা যেতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত গত এক দশকে একের পর এক দুর্নীতির ঘটনায় নড়বড়ে অবস্থায় পড়েছে। হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক বা পিপলস লিজিং—সব জায়গাতেই অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। এবার এক্সিম ব্যাংকের ঘটনাটি সেই দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনায় গ্রেফতার ও মামলা হলেও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব হচ্ছে না।
দুদক বলেছে, তারা এখন ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ, জামানত যাচাই, এবং প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা নিয়ে একটি বিস্তৃত অনুসন্ধান চালাচ্ছে। সংস্থার মুখপাত্র জানান, “এই মামলাটি একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এমন বার্তাই আমরা দিতে চাই।”
এক্সিম ব্যাংকের সাবেক এমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনের গ্রেফতারে ব্যাংকিং খাতের ভেতরে এক ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই গ্রেফতার হয়তো ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও দুর্নীতির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই গ্রেফতার কি সত্যিই বিচার ও জবাবদিহির নতুন যুগের সূচনা, নাকি আগের মতোই কিছুদিন পর সবকিছু আবারও থেমে যাবে?
বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ এখন সেই উত্তরটির অপেক্ষায়।