শিক্ষকদের আপত্তি সত্ত্বেও মাধ্যমিকে লটারি ভর্তি বহাল: শিক্ষার মান নিয়ে শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
শিক্ষকদের আপত্তি সত্ত্বেও মাধ্যমিকে লটারি ভর্তি বহাল: শিক্ষার মান নিয়ে শঙ্কা

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে বিতর্ক। ২০২১ সালে করোনা মহামারির সময়ে সাময়িকভাবে চালু হওয়া ডিজিটাল লটারি পদ্ধতি তখন অনেকের কাছেই ছিল সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু সাময়িকভাবে শুরু হওয়া সেই ব্যবস্থা এখন সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তির ‘স্থায়ী নিয়ম’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শিক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই লটারি পদ্ধতি শুধু শিক্ষার মান কমাচ্ছে না, বরং শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষক সমাজ বলছেন, প্রতিযোগিতা ছাড়া শিক্ষা মানে প্রাণহীন ক্লাসরুম। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে একসময় শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রস্তুত করত, পড়াশোনায় মনোযোগী হতো, এবং শ্রেণিকক্ষে এক ধরনের ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হতো। কিন্তু এখন সেই চিত্র উল্টো। একই শ্রেণিতে মেধাবী ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরা একসাথে পড়ছে, ফলে শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি ইতোমধ্যেই এই বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর তারা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে চিঠি দিয়ে লটারি পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানায়। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম লটারি পদ্ধতিতেই সম্পন্ন হবে। মন্ত্রণালয়ের মতে, এই পদ্ধতি স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর, ফলে এতে পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতির সুযোগ কম।

তবে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকরা ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরছেন। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক ও সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সদস্যসচিব মো. আব্দুল মুবীন বলেন, “একই ক্লাসে মেধাবী ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীকে একসাথে শেখানো কঠিন হয়ে পড়ে। আমি চল্লিশ মিনিটের ক্লাসে কখন কাকে বোঝাবো, কখন নিয়ন্ত্রণ করব— সেটাই বুঝে উঠতে পারি না। এতে মনোযোগী শিক্ষার্থীরাও হতাশ হয়।” তিনি বলেন, “অভিভাবকেরাও এখন হতাশ। ভর্তি পরীক্ষা হলে সন্তান কোয়ালিফাই না করলে তারা বুঝতে পারতেন ঘাটতি কোথায়। কিন্তু লটারিতে সেই সুযোগ নেই। এটি শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়ের মানসিক চাপে পরিণত হয়েছে।”

সবুজবাগ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আবদুস সালাম মনে করেন, লটারি ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার চেতনা ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, “আমি এ বিদ্যালয়ে দেখেছি শিক্ষার্থীরা একসময় পড়াশোনায় ভীষণ আগ্রহী ছিল। ভর্তি পরীক্ষার কারণে তারা প্রস্তুতি নিত, পরিশ্রম করত। কিন্তু এখন লটারি ব্যবস্থায় সে আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। মেধা বিকাশের জন্য প্রতিযোগিতা অপরিহার্য।”

ময়মনসিংহের এক সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, “লটারি যদি প্রথম শ্রেণির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে তা ঠিক ছিল। কিন্তু এখন অন্যান্য শ্রেণিতেও লটারি চলছে। এতে এমন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে যারা আগের শ্রেণিগুলো ঠিকভাবে শেষই করেনি। এক শ্রেণিতে যখন এমন শিক্ষার্থী থাকে— কেউ চতুর্থ শ্রেণি শেষ করেছে, কেউ করেনি, কেউ একেবারে নতুন— তখন পাঠদান খুব কঠিন হয়ে পড়ে।”

শিক্ষা বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান লটারি পদ্ধতিকে ‘বাজে সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, “লটারি কিংবা ভর্তি পরীক্ষা— কোনোটিই আদর্শ সমাধান নয়। আমাদের উচিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ক্যাচমেন্ট এরিয়া পদ্ধতিতে যাওয়া। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের আশপাশের শিক্ষার্থীদেরই সেখানে পড়তে দেওয়া। এতে সামাজিক বৈষম্য কমবে, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর অপ্রয়োজনীয় চাপও কমবে।”

তবে তিনি শিক্ষাব্যবস্থার মূল কাঠামোগত সমস্যার দিকেও ইঙ্গিত করেন। “আমরা শিক্ষায় জিডিপির মাত্র ১.৭ থেকে ১.৯ শতাংশ ব্যয় করি, যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়। এই কাঠামোয় শিক্ষায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়,” বলেন অধ্যাপক মজিবুর রহমান।

অন্যদিকে, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের আরেক অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমানের মতে, ভর্তি প্রক্রিয়ায় মেধা বিবেচনা অপরিহার্য। “শিক্ষার্থীর যোগ্যতা যাচাই না করে ভর্তি করালে শিক্ষার মান কখনোই উন্নত হবে না। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে কমপক্ষে মৌলিক যোগ্যতা যাচাই করা উচিত,” তিনি বলেন।

তবে নীতিনির্ধারকরা বলছেন, লটারি পদ্ধতি শুধু স্বচ্ছতাই নয়, সমঅধিকারও নিশ্চিত করছে। কারণ, আগে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, ঘুষ, সুপারিশ কিংবা কোচিং নির্ভর প্রতিযোগিতায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বাদ পড়ত। এখন প্রযুক্তি-নির্ভর লটারির ফলে সেই অনিয়ম অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার মতে, “শিক্ষক ও অভিভাবকদের আপত্তি আমরা শুনছি, তবে এখনই পদ্ধতি পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই। সরকার শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

তবে শিক্ষা বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, শুধু ভর্তি পদ্ধতি নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি শেখার আগ্রহ জাগানো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং কারিকুলামে সংস্কার আনাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান।

বর্তমানে শিক্ষার মান ও সুযোগের ভারসাম্য রক্ষা করতে লটারি পদ্ধতি কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে চলছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে শিক্ষকরা মানহ্রাসের আশঙ্কা করছেন, অন্যদিকে সরকার বলছে, এটি স্বচ্ছতা ও সমঅধিকারের পথ। এই দুই অবস্থানের মধ্যে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হাজারো শিক্ষার্থী ও অভিভাবক, যাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি ভাগ্যের টিকিটের উপর।

লটারি না মেধাভিত্তিক ভর্তি— এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এত সহজ নয়। কিন্তু যেটিই বেছে নেওয়া হোক, লক্ষ্য হওয়া উচিত একটাই— এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com