নদীরক্ষা প্রকল্পে দুর্নীতি নিয়ে ঝালকাঠিতে তোলপাড়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৮ বার
নদীরক্ষা প্রকল্পে দুর্নীতি নিয়ে ঝালকাঠিতে তোলপাড়

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীর তীররক্ষা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে স্থানীয় জনপদ ও প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ৬৮০ কোটি টাকার এই বিশাল প্রকল্পের কাজ শুরু থেকেই নানা অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। সম্প্রতি নিম্নমানের বালু, ওজনে কম জিও ব্যাগ, ব্লক তৈরিতে নিয়ম বহির্ভূত উপকরণ ব্যবহার এবং মনিটরিংঘাটতির মতো একের পর এক অনিয়ম সামনে আসায় প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করছেন, নদীর ভয়াবহ ভাঙনে যখন অঞ্চলের বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, তখন সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং অনিয়মজনিত কারণে প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, মানসম্মত কাজ হলে অন্তত কিছুটা হলেও নদীভাঙন রোধ করা সম্ভব হতো।

মাত্র কয়েক বছর আগেও সুগন্ধা নদীবেষ্টিত এই অঞ্চল ছিল স্থিতিশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষায় তীব্র ভাঙন দেখা দিলে নদী রক্ষায় বৃহৎ বাজেটের প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। একনেকের সভায় অনুমোদিত এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ৬৮০ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যার আওতায় সদর ও নলছিটি উপজেলার ১৩ দশমিক ২১৫ কিলোমিটার এলাকায় নদীরক্ষা কাজ হওয়ার কথা। তবে বাস্তবতা হলো, ৩৪টি প্যাকেজের মধ্যে এখনো মাত্র ১৭টির কাজ শুরু করা গেছে। প্রকল্প শুরু হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারিতে এবং ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা ছিল।

প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ২১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে তাদের হিসাব। তবে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, কাজের মান এবং সামগ্রিক বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। কুতুবনগর এলাকায় ৯ নভেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিম্নমানের বালু ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে বহু ব্লক। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসার পর টাস্কফোর্স ওই বালু বাতিল করে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত এসওকে প্রত্যাহার করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সাইট থেকে নিম্নমানের বালু অপসারণের জন্য চিঠি দেওয়া হলেও এখনো তা সরানো হয়নি। বরং বাতিল বালু এখনো সাইটের কোনো এক কোণে স্তূপ করে রাখা আছে, যা নিয়ে নতুন সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

এমনকি এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, ব্লক তৈরিতে নিয়ম ছিল ছয় অংশ বালুর সঙ্গে এক অংশ সিমেন্ট ব্যবহারের, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ১২ ভাগ বালুর সঙ্গে একভাগ সিমেন্ট মেশানো হয়েছে। বালুর গ্রেড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট পংকজ কুমার সরকার স্বীকার করেছেন, বালুর গ্রেড হওয়া উচিত ছিল ১ দশমিক ৫০ এফএম, কিন্তু ব্যবহৃত বালু ছিল ১ দশমিক ৩৭ এফএম। স্থানীয়দের দাবি, এটি আসলে আরও নিম্নমানের ছিল।

প্রকল্পের অন্যতম প্যাকেজ ভাটারিকান্দা এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। পুরো এলাকায় চলা কাজের সময় পানির ধারে শ্রমিকদের ব্লক ঢালাই করতে দেখা গেলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। ফোনে যোগাযোগ করার পর ঘণ্টাখানেক দেরিতে এসে হাজির হন তদারক কর্মকর্তা ওহিদুল ইসলাম। তার দাবি, বরাদ্দ থাকা এক লাখ ৮০ হাজার জিও ব্যাগের বেশিরভাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ, যেসব জায়গায় নদী বেশি গভীর, সেখানে ব্যাগ ফেলা হয়নি। তারা বলেছেন, নদীর ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে এখনো কাজ বাকি আছে এবং সেখানে প্রয়োজন কয়েকগুণ বেশি জিও ব্যাগ।

সাইটে ফেটে যাওয়া একটি জিও ব্যাগের ভেতরের বালু পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেখানে বালুর মান খুবই নিম্ন। প্রতিটি ব্যাগের ওজন হওয়া উচিত ২৭৫ কেজি, কিন্তু তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কোনো নিশ্চিত জবাব নেই। সাংবাদিকেরা ওজন পরিমাপের অনুরোধ করলে সাইটের সুপারভাইজার জানান, স্কেল রুম তালাবদ্ধ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ম্যানেজার আবেদ আলী আবার দাবি করেন, প্রতিটি ব্যাগে থাকার কথা ২৫০ কেজি বালু—যা নিজেই আরেকটি প্রশ্ন তৈরি করে।

নলছিটি উপজেলার তিমীরকাঠি এলাকায়ও ভাঙন বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, প্রতিরক্ষা কাজের কোনো সুফল এখনো চোখে পড়েনি। জিও ব্যাগ ফেলা হলেও অধিকাংশই নদীতে ভেসে গেছে বা ঠিকভাবে স্থাপন করা হয়নি। অনেকে বলছেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের ঘরবাড়ি বাঁচানো, কিন্তু অনিয়মে কাজের মান নিশ্চিত না হলে সব অর্থ পানিতে ভেসে যাওয়ার মতোই মনে হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা অবশ্য অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, নিম্নমানের বালু নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত এসওকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, বিভিন্ন সাইটে লোকবলের সংকট রয়েছে। ফলে মনিটরিং ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। জিও ব্যাগ না ফেলা অংশগুলো নিয়ে তিনি জানান, সেখানে বার্জ ঢোকা সম্ভব হয়নি, তবে ম্যানুয়াল উপায়ে ব্যাগ ফেলা হবে। তার দাবি, ২৪ হাজার জিও ব্যাগ রিজার্ভ আছে।

প্রকল্পের প্রজেক্ট ডাইরেক্টর (পিডি) পার্থ প্রতিম সাহা সাংবাদিকদের প্রশ্নে জানান, তিনি অনিয়মের বিষয়টি জেনেছেন এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন—এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে এতো বড় অনিয়ম কীভাবে চলল এবং কেন এতদিন কেউ নজর দেননি?

সুগন্ধা নদীর তীরবর্তী মানুষরা ইতোমধ্যে নদীভাঙনের ভয়াবহতা দেখেছেন। তাদের ঘর-বাড়ি, ফসলি জমি, বাজার থেকে শুরু করে সামাজিক পরিকাঠামোর একটি বড় অংশ নদীর গর্ভে হারিয়ে যেতে দেখেছেন। তাই তারা চান, প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হোক। কারণ এই কাজ কেবল একটি প্রকল্প নয়, বরং তাদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা।

তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। নিম্নমানের উপকরণ, দুর্বল তদারকি, ঠিকাদারদের অবহেলা এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকল্পটিকে শুরুতেই বিপদসীমায় নিয়ে গেছে। এভাবে চললে ৬৮০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের ভাগ্যে কী আছে—তা নিয়ে জনগণের মধ্যে গভীর সন্দেহ এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের আশা, তদন্ত করে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ নদীভাঙন থামানো শুধু একটি প্রকল্পের কাজ নয়—এটি একটি পুরো জনপদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত