প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজশাহীতে মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবদুর রহমানের ছেলে তাওসিফ রহমান (১৬) নিহত হওয়ার ঘটনায় ময়নাতদন্তে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। আজ শুক্রবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধানসহ দুই সদস্যের চিকিৎসক দল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ধারালো ও চোখা অস্ত্রের আঘাতে তাওসিফের শরীরের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি কেটে গিয়েছিল। এ কারণে দেহে প্রচুর রক্তপাত ঘটে এবং এতেই মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ময়নাতদন্ত সকাল পৌনে ১০টায় শুরু হয়। ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক কফিল উদ্দিন এবং প্রভাষক শারমিন সোবহান কাবেরী ময়নাতদন্ত করেন। প্রক্রিয়াটি প্রায় ৩০ মিনিট সময় নেয়। তাওসিফের বাবা, বিচারক আবদুর রহমান, ময়নাতদন্ত চলাকালীন সময় জ্ঞান রেখেছিলেন। পরে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক কফিল উদ্দিন তার সঙ্গে এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বিবরণ শেয়ার করেন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাওসিফের ডান ঊরু, ডান পা ও বাঁ বাহুতে ধারালো ও চোখা অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তিনটি জায়গার রক্তনালি কেটে গেছে, যা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাওসিফের শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণও ছিল।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাওসিফের গলায় কালশিরা দাগ আছে। পুলিশ পূর্বে জানিয়েছিল, তিনি শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নরম কাপড় দিয়ে শ্বাসরোধের কারণে এই দাগ তৈরি হতে পারে এবং এটি মৃত্যুর প্রধান কারণ নয়। তারা আরও বলেছেন, ধারালো অস্ত্রের আঘাত এবং শ্বাসরোধের চেষ্টা একসঙ্গে ঘটেছিল।
ঘটনার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজশাহী নগরের ডাবতলা এলাকায় তাওসিফ ভাড়া বাসায় নিহত হন। হামলাকারী লিমন মিয়া (৩৫) পূর্বপরিচিত ছিলেন। হামলায় তাওসিফের মা তাসমিন নাহার (৪৪) আহত হন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হামলাকারী লিমনও পুলিশের হেফাজতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে শুক্রবার বেলা ১১টা পর্যন্ত থানায় এ ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি।
তাওসিফের মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি জামালপুরে দাফনের জন্য নেওয়া হচ্ছে। লাশ গোসল এবং গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। স্থানীয় ও রাজনৈতিক নেতারা, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষ এই ঘটনার ব্যাপারে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পরিবার এবং এলাকার মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি কিশোরের মৃত্যুই নয়, এটি সমাজে অশান্তি এবং পারিবারিক ও পরিচিতজনের মধ্যে সংঘর্ষের এক মারাত্মক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ময়নাতদন্তের ফলাফল প্রমাণ করছে, শারীরিক আঘাত ও রক্তক্ষরণ কোনো কারণে মৃত্যুর প্রধান কারণ হতে পারে, যা এই ধরনের ঘটনা মোকাবিলায় সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তাওসিফের জীবন একটি সাধারণ কিশোরের মতোই স্বাভাবিক ছিল। তিনি নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারে দায়িত্বশীল ও শান্তিপ্রিয় চরিত্রের জন্য পরিচিত ছিলেন। তার আকস্মিক মৃত্যু পরিবার এবং এলাকাবাসীর মধ্যে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
পুলিশ ও ফরেনসিক বিভাগের তৎপরতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার জন্য প্রমাণ সংগ্রহ এবং তদন্তে জোর দিচ্ছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে সকল পক্ষের তৎপরতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
মোটকথা, রাজশাহীতে তাওসিফ রহমানের হত্যাকাণ্ড তার পরিবার, সমাজ এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। যথাযথ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে সামনের দিনে সামাজিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক শান্তি হুমকির মুখে পড়তে পারে।