প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যখন প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা দিয়েছিল, সেই অর্থ এখনই ফেরত নেওয়া হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো একীভূত হয়ে একটি নতুন ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই অর্থ পুনরুদ্ধার স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে একটি নীতিনির্ধারণী বৈঠকে। এই সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতের রণনীতিগত রূপান্তর ও স্থিতিশীলতার দিকে একটি বড় ধাপ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে বলা হয়েছে, একীভূতকরণের মাধ্যমে এই পাঁচটি ব্যাংক—এক্ষিম ব্যাংক (Exim Bank), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (First Security Islami Bank), সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (Social Islami Bank), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (Global Islami Bank) এবং ইউনিয়ন ব্যাংক (Union Bank) — একটি নতুন ব্যাংকে মিলিয়ে দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত নাম দেওয়া হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ (Unified Islami Bank) বা ‘ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’ (United Islami Bank)।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৫ সালের মধ্যে এই ব্যাংকগুলোকে তারল্য সংকট মোকাবিলায় রিফাইন্যান্স স্কিম, রেপো অপারেশন এবং বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে মোট প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। তবে এখন ব্যাংক নিয়ন্ত্রক মনে করছে, অর্থ ফেরত নেওয়ার আগে ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও দায়ের মূল্যায়ন, মূলধন কাঠামো নির্ধারণ, নতুন ব্যাংকের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই জরুরি। সহায়তা ফেরত নেওয়ার চাপ এখন রাখলে একীভূতকরণ প্রকল্পে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে তারা জানায়।
এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “এখন আমাদের দরকার টাকা ফেরত নেওয়া নয়; প্রধান কাজ ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল করা। একীভূত ব্যাংক গঠন কার্যকরভাবে হলে পরবর্তী দিকে হিসাব মিলিয়ে অর্থ ফেরত নেওয়া হবে।” এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ব্যাংক রূপান্তরের সময় গ্রাহক ও আমানতকারীদের আস্থা বজায় রাখা কঠিন হলেও চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগটি শুধু ব্যাংক সংকটের সাময়িক সমাধান নয়; বরং আর্থিক খাতের স্থায়িত্ব ও সেক্টরের শাসনব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতে দারুণ পরিবর্তন দরকার ছিল—ভিতরে লোপ্রবণ ঋণ, বড় আমানত শোষণ, শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই পাঁচ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঋণ সমস্যা, তারল্য সংকট ও শেয়ারবাজারে অবমূল্যায়ন এক ভয়াবহ মিশ্রণ তৈরি করেছে।
তবে এই একীভূতকরণ পরিকল্পনায় চ্যালেঞ্জও কম নয়। পৃথক ব্যাংক থেকে নতুন ব্যাংকে রূপান্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত, আইনগত, প্রশাসনিক প্রসেসগুলো এখনও শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। ব্যাংক শাসনব্যবস্থা ও তত্ত্বাবধান চাই এমন পরিকল্পনা, যাতে পুনরায় একই ভুল পুনরাবৃত্তি না হয়।
গ্রাহক এবং আমানতকারীরা উদ্বিগ্ন অবস্থায় রয়েছেন। তারা প্রশ্ন করছেন—আমাদের আমানত কি নিরাপদ? ব্যাংক রূপান্তর হলে কি আমানত ফেরাউ করা সহজ হবে? ব্যাংক বিনিয়োগে কি নতুন অবস্থা তৈরি হবে? এসব প্রশ্ন রয়ে গেছে। ব্যবস্থাপকরা বলছেন, নতুন ব্যাংক সদস্যদের জন্য আমানত সংরক্ষণের নতুন নীতি থাকবে এবং রূপান্তরকালে গ্রাহকদের সব সুবিধা রক্ষা করা হবে।
এই প্রসঙ্গে, ব্যাংক খাতে শাসনব্যবস্থা ও তত্ত্বাবধান বাড়ানোর গুরুত্ব সামনে এসেছে। ব্যাংক রূপান্তর প্রকল্প শুধুই করে দেওয়া হবে না—এর সাফল্য নির্ভর করছে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায়। যারা পুরনো সময়ের শাসনব্যবস্থা ও কৌশল অবলম্বন করেছে, তারা নতুন বাস্তবতায় টিকে থাকবে না—এমনই অভিমত বিশ্লেষকরা দিয়েছেন।
সেক্টরীয় বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, একক ব্যাংকে পরিবর্তনের ফলে আয়তন বাড়বে, সমন্বয় সহজ হবে, ঋণপরিশোধ ও তারল্য সংকট নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। কিন্তু অন্যদিকে, একাধিক দুর্বল ব্যাংককে একসাথে মিশিয়ে দিলে এক বড় দুর্বল ব্যাংক তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
সাধারণ জনগণের জন্য পরবর্তী বিষয়টা হচ্ছে—রূপান্তরকালে আমানতকারীর স্বার্থ কেমন রক্ষা হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক রূপান্তরের সময় সুসংহত গ্রাহক সেবা, আমানত সংরক্ষণের স্থিতিশীলতা ও নিয়ন্ত্রণ তত্ত্বাবধান রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় রূপান্তর নির্দেশ করছে। ব্যাংক রূপান্তর শুধু ওই পাঁচ ব্যাংকেই প্রযোজ্য নয়; এটি একসঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, শাসনব্যবস্থার পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা ফিরে আনার অঙ্গ। দেশের জনগণ, ব্যাংক গ্রাহক এবং বিনিয়োগকারীরা তিন-চোখে এই রূপান্তরের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করছেন।