রায় ঘোষণার দিনে ট্রাইব্যুনালে হাজির সাবেক আইজিপি মামুন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
রাজসাক্ষী চৌধুরী মামুনের কারাভোগে নতুন সিদ্ধান্ত

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার জন্য সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে আজ সোমবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। সকাল সাড়ে আটটার কিছু পর তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর সামনে উপস্থিত করা হয়। তার উপস্থিতি ঘিরে আদালত এলাকা, সুপ্রিম কোর্ট চত্বর এবং আশপাশের অঞ্চলে অভূতপূর্র্র্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সেনাবাহিনী ও বিজিবির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল-১–এর তিন সদস্যের বিচারিক বেঞ্চ—বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার, বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী—আজ এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। এই মামলার অপর দুই আসামি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান পলাতক রয়েছেন। ফলে সাবেক আইজিপি মামুনই হচ্ছেন মামলার একমাত্র গ্রেফতারকৃত এবং শারীরিকভাবে আদালতে উপস্থিত অভিযুক্ত।

গত বছরের জুলাই মাসে শুরু হওয়া গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাবলির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং তাদের নির্দেশনার উৎস নিয়ে বিতর্ক। অভিযোগপত্রে বলা হয়, উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা ও আশ্রয়ে একাধিক হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। মামুন সেই সময় দেশের সর্বোচ্চ পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি রাজনৈতিক নির্দেশনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তা করেন এবং বিভিন্ন সময়ে সরাসরি নির্দেশ প্রদান করেন।

তবে মামলার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় মোড় আসে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠনের দিন, যখন মামুন আদালতের সামনে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। আরও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে তার রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন, যা ট্রাইব্যুনাল নীতিগতভাবে গ্রহণ করে। আদালত জানায়, তিনি যদি সত্যনিষ্ঠভাবে সম্পূর্ণ তথ্য প্রদান করেন, তাহলে তার পক্ষে প্যারডন বা দুঃখমুক্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে। দেশের অতীত ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা খুবই সীমিত; একজন সাবেক আইজিপি এমন মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ার চেষ্টা করছেন—এটি অনেকের কাছে অভূতপূর্ব।

আদালত সূত্রগুলোর বরাতে জানা যায়, মামুনকে বিশেষ নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের পূর্ববর্তী আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে তাকে অন্যান্য বন্দীদের সঙ্গে রাখা যাবে না; তার জন্য বিশেষ সেল রাখা হয়েছে। আদালত আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে মামুনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণে তার ওপর হামলার ঝুঁকি থাকতে পারে। আজ তাকে আদালতে আনা হয় বাড়তি নিরাপত্তা স্করের আড়ালে, এবং সময়ের আগেই তার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন গত বৃহস্পতিবারই সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত মোতায়েনের জন্য চিঠি দিয়েছিল। এর পরপরই সেনাবাহিনী সুপ্রিম কোর্ট এলাকা, ট্রাইব্যুনাল ভবন এবং সংশ্লিষ্ট রাস্তা-পথগুলোকে নিরাপত্তার বিশেষ বলয়ে নিয়ে আসে। আজ সেই নিরাপত্তায় যুক্ত হয়েছে নতুন সদস্য, আর পুরো এলাকা রূপ নিয়েছে প্রায় সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের মতো। সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত, সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি, আর আইনজীবীদেরও অতি প্রয়োজন ছাড়া আদালত এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।

মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে যে সাক্ষ্য ও তথ্য রয়েছে, সেগুলোর বড় অংশ প্রকাশ পায়নি। তবে আদালতে উপস্থিত থাকা আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মামুন ট্রাইব্যুনালের সামনে যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তাতে তিনি শুধু নিজের ভূমিকা নয়, উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ভূমিকাও তুলে ধরেছেন। এটি মামলার ফলাফলে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন। তিনি অবিকৃত সত্য প্রকাশে রাজি হয়েছেন বলে জানা যায়, যা তাকে আদালতের কাছে সহনীয় দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আদালত জানিয়েছে, তার সাক্ষ্য যদি অসত্য, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিমূলক প্রমাণিত হয়, তবে তাকে সর্বোচ্চ সাজাও দেওয়া হতে পারে।

অন্যদিকে, পলাতক দুই আসামির বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া অনুপস্থিতিতে চলায় রায় ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে জনপ্রিয় নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগ—এটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকে বলছেন, রায় যাই হোক না কেন, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশাল প্রভাব ফেলবে। অন্য একটি অংশ মনে করেন, একদিকে বিচার চলছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হবে।

এদিকে আদালত এলাকায় সাধারণ মানুষের উপস্থিতি আজ তুলনামূলক কম। সকাল থেকে বেশ কয়েকটি রাস্তা বন্ধ করে দেয় নিরাপত্তা বাহিনী। যানবাহনের প্রবেশে ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণ। মানুষ শুধু দূর থেকে বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি জানার অপেক্ষায়। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও আজ সতর্ক অবস্থানে আছে। কেউ প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান না নিলেও, রায় ঘোষণার পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে—সেটি নিয়ে সকল পক্ষই নীরব উদ্বেগে আছে।

আইনজীবী মহলে আলোচনা চলছে, আদালত মামুনকে রাজসাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করলে এবং তার তথ্য-প্রমাণ আদালতকে সন্তুষ্ট করলে, মামলার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। কারণ মামুন ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুলিশ কর্মকর্তা; তার মুখ থেকে বের হওয়া যেকোনো তথ্য অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, যদি আদালত মনে করেন তিনি নিজের দোষ লাঘবের জন্য কিছু তথ্য লুকাচ্ছেন বা ঘুরিয়ে বলছেন, তবে তাকে কঠোর সাজা পেতে হতে পারে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নতুন নয়; তবে একটি সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন বিচার, বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানের মতো অস্থির সময়ে, দেশের বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক বড় পরীক্ষা। আজকের রায় সেই পরীক্ষার পরবর্তী ধাপকে চিহ্নিত করবে। রায় যেভাবেই আসুক, তা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে—এমনটিই বিশ্লেষকদের অভিমত।

এই মুহূর্তে আদালতের ভেতরে উত্তেজনা, বাইরে অপেক্ষা, আর পুরো জাতির দৃষ্টি আজ ট্রাইব্যুনালের দিকে। রায় ঘোষণার মাধ্যমে শুধু একটি মামলার বিচার নয়—একটি অস্থির সময়ের সত্য উদঘাটন এবং ভবিষ্যতের পথচলা নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সাবেক আইজিপি মামুনের উপস্থিতি সেই অধ্যায়ের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছে, আর দেশ অপেক্ষা করছে—বিচারের কাঠগড়ায় সত্য কতটা উন্মুক্ত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত