সর্বশেষ :
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবাসী কল্যাণ খাতে বরাদ্দ কমায় উদ্বেগ তামাকমুক্ত বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে বাধা হতে পারে প্রস্তাবিত বাজেট: বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ নতুন চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগে গতি ফিরবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল নয়, লাইসেন্স বাতিল হয়েছে প্যাথলজি সেন্টারের: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা খুলনায় গুলিতে নিহত বিএনপি নেতা ঢাকাইয়া রফিক, এলাকায় চাঞ্চল্য বাজেটে ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি, সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন জামায়াতের রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারে জেলা কমিটি বাজেটে সংস্কার দেখছেন না নাহিদ ইসলাম দেশকে সম্মানে ফেরানোর অঙ্গীকার মঈন খানের চলে গেলেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী ব্রিতো

ইরান যুদ্ধের সুবর্ণ সুযোগে তুরস্কে এরদোয়ানের ক্ষমতা সুসংহতকরণের গল্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬
  • ৩৮ বার

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত মার্কিন ও ইসরাইল বিরোধী ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতি যখন চরম উত্তপ্ত, ঠিক তখনই এই ভূরাজনৈতিক সংকট থেকে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক সুবিধাভোগী বা ‘আসল বিজয়ী’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। চলমান এই যুদ্ধকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের কোনো প্রকার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছাড়াই নিজ দেশের অভ্যন্তরে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পোক্ত করা এবং গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপসরণকে ত্বরান্বিত করার এক সুবর্ণ সুযোগ লুফে নিয়েছেন তিনি।

সমগ্র বিশ্বের নজর যখন ইরান যুদ্ধের দিকে নিবদ্ধ, ঠিক সেই মোক্ষম মুহূর্তটিকে কাজে লাগিয়ে এরদোয়ান একদিকে যেমন দেশের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিরোধীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়ন চালাচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বমঞ্চে তুরস্কের কূটনৈতিক ও সামরিক অবস্থানকে নিয়ে যাচ্ছেন এক অনন্য উচ্চতায়।

সম্প্রতি তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) সদর দপ্তরে দাঙ্গা পুলিশের জোরপূর্বক প্রবেশ এবং ভেতরের সমর্থকদের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই বর্বরোচিত অভিযানের মাত্র তিন দিন আগে একটি আজ্ঞাবহ তুর্কি আদালতের মাধ্যমে দলটির শীর্ষ নেতা ওজগুর ওজেলকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে পদচ্যুত করা হয়। দেশের সাধারণ নাগরিক এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলার এই নগ্ন প্রচেষ্টাকে এরদোয়ানের একচ্ছত্র ক্ষমতা লিপ্সার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের তুরস্ক প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক গোনুল তোল এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, এরদোয়ানের জন্য অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করার জন্য এটি একটি নিখুঁত আন্তর্জাতিক পরিবেশ। এই ভূরাজনৈতিক ধাক্কাগুলো তাকে দেশের অভ্যন্তরে অবশিষ্ট গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে যা খুশি তা-ই করতে চরমভাবে উৎসাহিত ও প্ররোচিত করছে।

একই সঙ্গে এরদোয়ান ২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক কূটনৈতিক শূন্যতাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছেন। এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এমন একটি ভিন্ন সমীকরণ তৈরি করেছে যেখানে ইউরোপীয় দেশ, ন্যাটো মিত্র এবং আঞ্চলিক প্রতিবেশীরা নিজেদের স্বার্থেই এরদোয়ানের সঙ্গে কাজ করতে এক প্রকার বাধ্য হচ্ছে। এর আগে এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইস্তাম্বুলের অত্যন্ত জনপ্রিয় মেয়র একরেম ইমামোগ্লুকে গ্রেপ্তারের পর ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তুরস্কে এক বিশাল গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছিল।

কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ৯ দিন পর তড়িঘড়ি করে ইমামোগ্লুর বিতর্কিত বিচার কাজ শুরু করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি থেকে শুরু করে অপরাধমূলক সংগঠন পরিচালনার সাজানো অভিযোগ এনে সম্মিলিতভাবে ২ হাজার বছরেরও বেশি কারাদণ্ডের খড়গ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইমামোগ্লু এই সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করলেও, ইরান যুদ্ধের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া এই বিচার নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে কোনো টু শব্দ বা সমালোচনা আসেনি।

প্রকৃতপক্ষে, ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অত্যন্ত অল্প ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর থেকেই এরদোয়ান সরকারের জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা লেগেছে, যার মূল কারণ তুরস্কে বর্তমানে চলমান গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশের আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি। এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতে এবং ২০২৮ সালের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগেই বিরোধীদের সম্পূর্ণ কোণঠাসা ও নিশ্চিহ্ন করতে তিনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো করছেন।

আমেনা স্ট্র্যাটেজিসের সহযোগী ইউসুফ ক্যান এ প্রসঙ্গে বলেন, এরদোয়ানের সরকার খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে ১০-১৫ বছর আগে তাদের যে বিপুল জনসমর্থন ছিল, তা এখন অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তলানিতে ঠেকেছে। আর ঠিক এ কারণেই তারা প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি-কে সমূলে ধ্বংস করতে এই ধরনের চরম দমনমূলক ও কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে, যেখানে ইরান যুদ্ধ তাদের জন্য এক ঢাল হিসেবে কাজ করছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দমন-পীড়ন চালালেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে নিজেদের বৈশ্বিক প্রভাব জ্যামিতিক হারে বাড়াচ্ছেন এরদোয়ান। এই অঞ্চলের অনেক দেশই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে তুরস্কের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। যার ফলশ্রুতিতে মে মাসে ইরাক তুরস্কের কাছ থেকে ২০টি অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এছাড়া এ মাসেই দূরপ্রাচ্যের দেশ ইন্দোনেশিয়া তুরস্ক থেকে ৬০টি চালকবিহীন শক্তিশালী যুদ্ধবিমান ‘বায়রাক্তার কিজিললেমা’ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার সরবরাহ ২০২৮ সাল থেকে শুরু হবে। পাশাপাশি পর্তুগালকে দুটি সামরিক সহায়তা জাহাজ সরবরাহের জন্য একটি চুক্তিও বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে।

অস্ত্র বাজারের এই সাফল্যের ওপর ভর করে এরদোয়ানের অধীনে তুরস্ক আজ বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে, যাদের তৈরি ড্রোন ইউক্রেন থেকে লিবিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। গোনুল তোল মনে করেন, এই প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বগুলো এমন এক সময়ে এরদোয়ানের অভ্যন্তরীণ অবস্থানকে চাঙ্গা করছে এবং রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করছে যখন দেশের ভেতরে তার বৈধতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

একই সঙ্গে এটি সংকটে থাকা তুরস্কের অর্থনীতির জন্য বিশাল বৈদেশিক আর্থিক সংস্থান তৈরি করছে। শুধু সামরিক খাতেই নয়, এরদোয়ান তুরস্ককে বিশ্বের একটি প্রধান জ্বালানি বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করতে চান, যা মূলত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলন, নতুন পাইপলাইন স্থাপন এবং সমুদ্র বন্দরগুলোকে সংযুক্ত করবে। ওজেলের অপসারণের পর এরদোয়ান নিজেই তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘তুরস্কের লক্ষ্য দর্শক হয়ে থাকা নয়, বরং এই প্রতিযোগিতায় গেম চেঞ্জার হওয়া।’

বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেই বলছেন, এরদোয়ানের এই বৈশ্বিক গেম চেঞ্জার হওয়ার অর্থ হলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধীদের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও নিশ্চিহ্ন করা। আঙ্কারা এমনকি পারস্য উপসাগর থেকে স্থানান্তরিত হতে চাওয়া ধনী বিদেশিদের তুরস্কে আকৃষ্ট করতে ২০ বছরের দীর্ঘ ট্যাক্স ছুটির মতো লোভনীয় প্রস্তাব দিচ্ছে।

আগামী জুলাইয়ের শুরুতে যখন এরদোয়ান ন্যাটো জোটের একটি বড় সম্মেলনের আয়োজন করবেন, তখন তিনি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত সুবিধা নিয়ে বিশ্বনেতাদের সাথে কথা বলবেন। ন্যাটো এখন আর গণতান্ত্রিক বিশ্বের সংজ্ঞা ধরে রাখছে না, বরং তারা স্বৈরাচারী শাসকদের প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতার ওপরই বেশি ফোকাস করছে, যা প্রকারান্তরে এরদোয়ানের মতো স্বৈরশাসকদের আরও বেশি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে সাহায্য করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত