প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সমীকরণকে আরও উত্তপ্ত করে বেইজিংয়ের তীব্র সমালোচনা ও আপত্তি সত্ত্বেও নিজেদের সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে জাপান। টোকিওর ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী ও আগ্রাসী নিরাপত্তা অবস্থানের বিরুদ্ধে চীনের ধারাবাহিক সমালোচনার কড়া জবাব দিয়ে রোববার এক আন্তর্জাতিক ফোরামে এই ঘোষণা দেন জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি।
কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্যের তীর যে স্পষ্টভাবেই বেইজিংয়ের দিকে ছিল, তা বুঝতে কারও বাকি নেই। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দূরপ্রাচ্যের দুই অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তির মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছাল।
বর্তমানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন সরকার দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জাপান যে শান্তিবাদী এবং রক্ষণাত্মক প্রতিরক্ষানীতি অনুসরণ করে আসছিল, তা থেকে তারা এখন দ্রুত সরে আসছে। ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ উৎসাহ ও সমর্থনে টোকিও এখন অনেক বেশি সক্রিয় এবং আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষানীতির দিকে নিজেদের স্থানান্তর ত্বরান্বিত করেছে।
তবে জাপানের এই কৌশলগত ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনকে বেইজিং মোটেও ভালো চোখে দেখছে না। চীনের পক্ষ থেকে বারবার টোকিওর এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও তিরস্কার করা হয়েছে। বেইজিংয়ের মূল অভিযোগ হলো, টোকিও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একটি বিপজ্জনক ‘নতুন সামরিকবাদ’-এর বেপরোয়া নীতি অনুসরণ করছে, যা এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও শান্তিকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।
সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ার শীর্ষ প্রতিরক্ষা ফোরাম ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’-এ যোগ দিয়ে জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি চীনের এই সব অভিযোগের অত্যন্ত যৌক্তিক ও কড়া জবাব দেন। বেইজিংয়ের নাম না নিয়ে তিনি উপস্থিত বিশ্বনেতা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের সামনে বলেন যে, চীনের এই অভিযোগ বাস্তবতা থেকে বহু দূরে। তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, একটু গভীরভাবে ভাবলেই বোঝা যাবে আসল সত্যটা কী। এমন একটি দেশ এই অঞ্চলে রয়েছে, যাদের সামরিক ভান্ডারে শত শত পারমাণবিক অস্ত্র এবং দূরপাল্লার কৌশলগত বোমারু বিমানের এক বিশাল ও ভয়ংকর মজুত রয়েছে। অথচ জাপানের কাছে এর কোনোটিই নেই। এমন বাস্তবতার পরও যখন পরমাণু শক্তিহীন জাপানকে ‘নতুন সামরিকবাদ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, তখন বিষয়টি অত্যন্ত অদ্ভুত ও হাস্যকর শোনায়। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চীনের কাছে বর্তমানে শত শত পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা অত্যন্ত দ্রুত ও গোপনে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার নজিরবিহীন বিকাশ ঘটিয়ে চলেছে।
প্রকৃতপক্ষে, দুই দেশের এই বিরোধের সূত্রপাত আরও আগে। গত নভেম্বর মাসে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি এক ভাষণে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, চীন যদি স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে সেখানে কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন বা দখল করার চেষ্টা চালায়, তবে জাপান হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নিজেদের স্বার্থে জাপান সেখানে সরাসরি সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সেই মন্তব্যের পর থেকেই এশিয়ার এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যুদ্ধ চরমে পৌঁছায়। সিঙ্গাপুরের এই ফোরামে কোইজুমি আবারও সেই উদ্বেগের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, চীন পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ছাড়াই তাদের সামরিক বাজেট এবং সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, যা জাপানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক গভীর ও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
চীনের এই আপত্তির মুখেও জাপান তার সামরিক আধুনিকায়নের পরিকল্পনা থেকে পিছপা হবে না বলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, টোকিও সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে এবং উচ্চ মাত্রার স্বচ্ছতা বজায় রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সর্বাধুনিক চালকহীন ড্রোন ব্যবস্থা, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ নিরাপত্তার মতো আধুনিক ক্ষেত্রগুলোতে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলছে। শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জাপানের যে দীর্ঘদিনের গৌরবময় অতীত ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তা চীনের কোনো মিথ্যা বা বানোয়াট দাবির দ্বারা ক্ষুণ্ন হবে না।
এবারের শাংরি-লা ডায়ালগে বিশ্বের প্রায় ৪৫টি দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা একত্রিত হয়েছেন। তবে জাপান ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তীব্র বিরোধের জেরে চীন এবার এই ফোরামে অত্যন্ত ছোট ও দুর্বল একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। এমনকি টানা দ্বিতীয় বছরের মতো চীনের মূল প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডং জুন এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে অংশ নেননি। চীনের এই এড়িয়ে যাওয়ার নীতি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কোইজুমি বলেন, বেইজিংয়ের এই অনীহার কারণে এবার দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা একটি ফলপ্রসূ বৈঠক করার সুযোগ না হওয়ায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত দুঃখ বোধ করছেন। তবে আলোচনা হোক বা না হোক, নিজেদের দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাপান যে সামরিক শক্তির পথেই হাঁটছে, তা এখন পরিষ্কার।