ট্রাইব্যুনাল ঘিরে নিরাপত্তার লৌহবেষ্টনী, রায় শুনতে জাতির অপেক্ষা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
ট্রাইব্যুনাল ঘিরে নিরাপত্তার লৌহবেষ্টনী, রায় শুনতে জাতির অপেক্ষা

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার হৃৎকেন্দ্র কার্জন হল-সংলগ্ন প্রধান সড়কটি আজ সোমবার ভোর থেকেই অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছে। সাধারণ দিনের মতো ব্যস্ততা বা যানবাহনের শব্দ নেই; বরং দেখা গেছে সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থান, সড়কের একপাশ পুরোপুরি বন্ধ, আর দূর থেকে আসা মানুষের উৎকণ্ঠিত মুখ। যেন এক শহর শ্বাসরোধ করে অপেক্ষা করছে এক ঐতিহাসিক রায়ের ঘোষণার জন্য।
আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ ঘোষিত হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়—যার প্রধান আসামি দেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রায়টি শুধু আইনি সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক, নৈতিক ও মানবিক ইতিহাসের ভবিষ্যত পথনির্দেশ করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শহরজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এরই ইঙ্গিত বহন করে। ভোর থেকে ট্রাইব্যুনাল এলাকার প্রধান সড়কে সেনা মোতায়েন বাড়তে থাকে দ্রুত। রোববার রাতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পাঠানো চিঠির পরই হাইকমান্ড সেনা সদস্য মোতায়েনের নির্দেশ দেয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রায়ের তারিখ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই একইভাবে সুপ্রিম কোর্ট ও ট্রাইব্যুনাল এলাকায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল।

আগামী কয়েক ঘণ্টা দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—এই অনুভূতি নিয়েই ঘুম থেকে উঠেছে গোটা জাতি। বিভিন্ন স্থানে মানুষের আনাগোনা শুরু হলেও আদালত এলাকার দিকে সাধারণ মানুষের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। মাঝে-মধ্যে দূর থেকে শোনা যাচ্ছে গাড়ির সাইরেন, আর সেনা টহলের দৃঢ় পায়ের শব্দ। যে কোনো অস্থিরতা ঠেকাতে কোণায় কোণায় দাঁড়িয়ে আছে নিরাপত্তা বাহিনী।

এদিকে রায়ের প্রতীক্ষায় শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের চোখ আজ নিবদ্ধ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দিকে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তাল পরিস্থিতির পর সরকারের সর্বোচ্চ পদধারী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় ঘোষণা বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম। রায়ের গুরুত্ব ও প্রভাব তাই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিরাট ও বহুমাত্রিক।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন সদস্যের বেঞ্চ রায় ঘোষণা করবেন। বেঞ্চের সভাপতিত্ব করছেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার। সঙ্গে রয়েছেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। তাদের এই রায় শুধু অভিযুক্তদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের সীমা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্রে যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা দেশজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বিক্ষোভ চলাকালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের আন্দোলনকারীদের দমনে সরাসরি নির্দেশ দেন। এসব নির্দেশের ফলে ঘটে বহু হত্যাকাণ্ড, গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা, অঙ্গহানি, নির্যাতন ও নিপীড়ন।

তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয় এবং ২৫ হাজারের বেশি আহত হন। চোখ, হাত-পা হারানো বহু তরুণ আজও চিকিৎসার ভারে জর্জরিত। বহু পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে নিঃসহায় হয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন শহর, জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো আজও বহন করছে সেই ঘটনার দাগ।

মামলায় আনা পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রথম অভিযোগটি হলো শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের ১৪ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য। সেখানে তিনি ছাত্র আন্দোলনকারীদের “রাজাকারের বাচ্চা”, বলেছিলেন—যা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এক ধরনের উসকানিরূপে ব্যবহৃত হয় বলে মনে করে প্রসিকিউশন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ঐ বক্তব্যের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র দলীয় কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর সুপরিকল্পিত আক্রমণ চালায়।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের দমন ও “নির্মূল” করার নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। এ নির্দেশ বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। এই অভিযোগ দেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। কারণ যেদিন রাজধানীর আকাশে হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছিল, সেদিনই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সড়কে সাধারণ মানুষও জানতে পারেনি কোন দিকে বিপদ ঘনিয়ে আসছে।

তৃতীয় অভিযোগ এসেছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সেই তরুণ গুলিতে নিহত হন। এমন মৃত্যুতে রংপুরসহ সারাদেশের শিক্ষার্থীদের ভেতর তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল।

চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনকারী ছয় যুবককে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। সেদিনকার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কোনো সতর্কতা বা আগাম ঘোষণা ছাড়াই গুলিবর্ষণ শুরু হয়। নিহতের পরিবারগুলো তখন থেকেই বিচার দাবি করে আসছে।

পঞ্চম অভিযোগটি সবচেয়ে মর্মান্তিক—‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন আশুলিয়ায় আন্দোলনকারী কয়েকজন তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং তাদের লাশ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, সেদিন আগুনে পুড়তে থাকা লাশগুলোর মধ্যে একজন তখনও জীবিত ছিলেন। এই অভিযোগ শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও বিস্মিত করেছে।

আজকের রায় তাই কেবল একটি মামলার সমাপ্তি নয়। এটি এক জাতির হৃদয়ের গভীর ক্ষতের প্রতিকার চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। একদিকে আজাদি কামনাকারী নতুন প্রজন্ম, অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহারের দীর্ঘ ছায়া—এই দুই প্রান্তিক বাস্তবতার ভারসাম্যই আজ বিচারকের কলমে ফুটে উঠবে।

ট্রাইব্যুনালের বাইরে জনতার ভিড় কম হলেও উত্তেজনার ঘনত্ব সর্বোচ্চ। বাতাসে চাপা উৎকণ্ঠা। মানুষ জানে, এই রায় ভবিষ্যতের রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা, ক্ষমতার সংস্কৃতি—সবকিছুকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে পারে।

এমন এক দিনে কার্জন হল-সংলগ্ন একটি সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়াই শুধু দৃশ্যমান চিত্র নয়; বরং দেশও যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে—একটি সিদ্ধান্তের সামনে, যা বহু প্রজন্ম ধরে পুনঃউচ্চারিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত