প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গণ-অভ্যুত্থানের নেপথ্যে ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী ঘটনার তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া প্রায় ৩৯৭ দিন পর আজ পরিণতি পেতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে প্রথম মামলার কার্যক্রম শুরু হয় গত বছরের ১৭ অক্টোবর। ঐদিনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলার (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) কার্যক্রম শুরু হয়। একই দিনে ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
প্রাথমিকভাবে এই মামলায় একমাত্র আসামি ছিলেন শেখ হাসিনা। তবে চলতি বছরের ১৬ মার্চ সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকেও আসামি করা হয়। সময়সীমা বৃদ্ধির পর ১২ মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই দিনই সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নামও আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১২ মে থেকে মামলার তিনজন আসামি হলো শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান এবং চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ১ জুন ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ফরমাল চার্জের মাধ্যমে মামলাটি আনুষ্ঠানিক বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করে। ১০ জুলাই ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন এবং একই দিনে সাবেক আইজিপি মামুন রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল আবেদন অনুমোদন করে, ফলে মামলায় তার সাক্ষ্য গ্রহণ সম্ভব হয়।
মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় ৩ আগস্ট। এদিন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সূচনা বক্তব্য সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। এরপর প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন খোকন চন্দ্র বর্মণ, যিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় গুরুতর আহত হন। তার সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মোট ৫৪ জনের জবানবন্দি নেওয়া হয়। এর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও সাক্ষী ছিলেন। সাক্ষী প্রমাণের মাধ্যমে মামলায় অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে কোন কোন অপরাধ প্রমাণিত হচ্ছে। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয় ৮ অক্টোবর। এরপর ১২ অক্টোবর থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়, যা শেষ হয় ২৩ অক্টোবর।
এ মামলার বিষয়বস্তু ছিলো গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী ঘটনা। অভিযোগে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র সহায়ক এবং সরকারি দপ্তরের সহযোগিতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নিরীহ মানুষদের উপর পদ্ধতিগত আক্রমণ চালানো হয়। অভিযোগে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়, যে এই ঘটনায় আহত ও নিহতদের সংখ্যা হাজারের বেশি, এবং অনেকেই স্থায়ীভাবে অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন।
মামলার পুরো প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশিকা অনুসরণ করে, সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ ও সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তিন আসামি—শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন—নিজেদের পক্ষে আইনজীবীর মাধ্যমে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। চিফ প্রসিকিউটর ও রাষ্ট্রপক্ষ আইনজীবী মামলার প্রমাণগুলো উপস্থাপন করেছেন এবং আদালতের কাছে অভিযুক্তদের অপরাধ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন।
মামলার ৩৯৭ দিনের এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু আদালতের কার্যক্রমের হিসাবই নয়, এটি দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তও বটে। এটি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে উচ্চপদে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়ার সূচনা। পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় দেশের এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর ছিল। ট্রাইব্যুনালের রায় আজ দেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।
আজকের রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রমের একটি দীর্ঘ যাত্রা শেষ হচ্ছে, যা শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর। এই যাত্রা ছিল কঠিন, সময়সাপেক্ষ এবং মানবিকভাবে জটিল। প্রত্যেকটি সাক্ষ্য, প্রতিবেদন এবং যুক্তিতর্ক এই মামলার গুরুত্বকে আরও বৃদ্ধি করেছে। দেশের মানুষ, আইন বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সরাসরি আদালতের কার্যক্রম মনোযোগ সহকারে অনুসরণ করেছেন।
এ মামলার রায়ে তিন আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণিত অপরাধের ধরন, অভিযোগের প্রমাণ এবং শাস্তি নির্ধারণের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে আসবে। রায়ের অংশবিশেষ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে, যাতে দেশের মানুষ আদালতের কার্যক্রমের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারে।
মামলার এই দীর্ঘ ৩৯৭ দিনের যাত্রা শুধু আইনি প্রক্রিয়ার হিসাবই নয়, এটি মানুষের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। জনগণ এই মামলার মাধ্যমে আশা করেছেন যে, আইন সব অবস্থাতেই সমানভাবে প্রয়োগ হবে এবং শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও বিচারবহির্ভূত নয়। আজকের রায় সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাবে।
শুরুতে শুধু একজন আসামি ছিলেন, পরে তিনজন আসামি যুক্ত হন। সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রমাণের গুরুত্ব, সাক্ষীদের সাহসিকতা এবং ট্রাইব্যুনালের সুষ্ঠু প্রক্রিয়া, বিচার ব্যবস্থার প্রতি দেশের আস্থা বৃদ্ধি করেছে। রায়ের ফলাফল যাই হোক, এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে থাকবে।
৩৯৭ দিনের এই যাত্রা দেশবাসীর জন্য একটি স্মরণীয় অধ্যায়। আজকের রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটছে, যেখানে বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিকোণ, ন্যায়বিচার ও দেশের আইনের মর্যাদা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। আজকের এই দিন বাংলাদেশে আইনি ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।