সর্বশেষ :
প্রশাসনিক কাজে জবাবদিহি নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর মে মাসে বিজিবির অভিযানে ১৭৭ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ, সীমান্তে কড়াকড়ি জোরদার ৭৯ হাজার ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ নিয়ে নতুন বিতর্ক, যাচাই প্রক্রিয়া ঘিরে আলোচনা যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বিএনপির প্রতিনিধি সমাবেশ অনুষ্ঠিত দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন, স্বস্তিতে ক্রেতারা বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: মত বিশ্লেষকদের ১৭ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত অনুমোদন, জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্ব ই-হেলথ কার্ডে রোগীর সব চিকিৎসা রেকর্ড এক প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্পের ঋণ নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক

ইরানে তীব্র খরা মোকাবিলায় ক্লাউড সিডিং অভিযান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৫ বার
ইরানে তীব্র খরা মোকাবিলায় ক্লাউড সিডিং অভিযান

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরান এখন তীব্র খরার মুখোমুখি। দেশটির বিশাল অঞ্চল জুড়ে পানির অভাব, শুকনো হাওয়া এবং ফসলের জন্য মারাত্মক ক্ষতি এই মুহূর্তে নাগরিক ও কৃষকদের জীবনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সর্ববৃহৎ হ্রদ উরমিয়া’র অববাহিকার ওপর দিয়ে ক্লাউড সিডিং বা মেঘে রাসায়নিক ছড়িয়ে বৃষ্টি নামানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইরান। সোমবার (১৭ নভেম্বর) রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা ইরনা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ইরানের জাতীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদী গড়ের তুলনায় প্রায় ৮৯ শতাংশ কমেছে। এটি গত অর্ধশতকের মধ্যে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাতের শর্ত তৈরি করেছে। এই অভূতপূর্ব খরা দেশের পানি সরবরাহ এবং কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উরমিয়ার অববাহিকার ওপর ক্লাউড সিডিং করা ইরানের জন্য ঐতিহাসিক ও জরুরি পদক্ষেপ, যা আগামী মাসগুলোতে ফসলের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে পারে।

ক্লাউড সিডিং বা বৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় সাধারণত মেঘের মধ্যে সিলভার আয়োডাইড, সোডিয়াম ক্লোরাইড বা অন্যান্য রাসায়নিক ছড়িয়ে বৃষ্টি উৎপন্ন করার চেষ্টা করা হয়। ইরান বহু বছর ধরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। তবে, এবারের উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে কারণ এটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ খরার মোকাবিলার এক বাস্তব পদক্ষেপ।

উরমিয়া লেকের আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী খরা এবং কম বৃষ্টিপাতের কারণে জলাধারগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। উরমিয়া লেকের পূর্ববর্তী অবস্থাকে যদি মনে করা যায়, মাত্র দুই দশক আগে এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম হ্রদ ছিল। হ্রদের তীরে হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং পর্যটন শিল্প বিকশিত ছিল। তবে বর্তমানে এই অঞ্চলে নৌকাগুলো মরিচাধরা শুকনো মাটির ওপর পড়ে আছে। অনেক ছোট ছোট নদীও শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা কৃষিজমিতে পানি জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

কৃষক ও জনসাধারণের জন্য এই খরা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, মানবিক সংকটও সৃষ্টি করেছে। কৃষকরা ফসলের ক্ষতি, মাটি শুকনো হওয়া এবং জমিতে কাজ করতে না পারার কারণে হতাশার মুখে পড়েছেন। গ্রামীণ এলাকায় মানুষ নলকূপ, নদী ও হ্রদ থেকে পানির জন্য দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনসাধারণের জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ জলাধার ও পানি সংরক্ষণের জন্য দেশব্যাপী কঠোর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। মানুষকে পানি সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হচ্ছে। শহরাঞ্চলে পানি ব্যবহার কমানোর জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানি সাশ্রয় করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনও খরাকে আরও গুরুতর করেছে। বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইরানে বৃষ্টিপাতের অনিয়মিত pattern তৈরি হয়েছে। তেহরানসহ প্রধান শহরগুলোর পানীয় জলের সরবরাহও এখন উদ্বেগের মধ্যে। রাষ্ট্রীয় প্রেস টিভি জানিয়েছে, মূল শহরগুলোতে আগামী কয়েক মাসের জন্য পানি সংকটের সম্ভাবনা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।

ক্লাউড সিডিং অভিযান শুরু হলেও এটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি প্রাথমিক এবং তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ মাত্র। দীর্ঘমেয়াদে পানির চাহিদা এবং প্রাকৃতিক জলাধারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাকৃতিক সংরক্ষণ, কৃষি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, এবং জল পুনর্ব্যবহারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক।

জনগণও এই অভিযানকে আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, মেঘে রাসায়নিক ছড়িয়ে বৃষ্টি নামানো হলে কমপক্ষে মৌসুমের ফসল বাঁচানো সম্ভব হবে। এছাড়া, শহরের সাধারণ মানুষও পানি সংকটের তীব্রতা কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে বলে আশা করছে। তবে সবাই একমত যে, এটি একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ এবং প্রকৃত বৃষ্টিপাত কতটা হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের মতো দীর্ঘমেয়াদী খরার সম্মুখীন দেশে ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। তবে এটি পরিবেশ, পানি সংরক্ষণ এবং কৃষি উৎপাদনের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এ ধরনের অভিযান শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা প্রতিক্রিয়ামূলক নয়, বরং জননিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্যও অত্যন্ত জরুরি।

উরমিয়া হ্রদের আশেপাশের বাসিন্দাদের জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এই অভিযান। হ্রদের পানি বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় কৃষক, মৎস্যজীবী এবং পর্যটন শিল্পের লোকেরা স্বল্প সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে খরা মোকাবিলায় আরও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে যে, জলাধারগুলোতে বৃষ্টিপাতের কম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নকশামাফিক পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে না। নদী, হ্রদ এবং কৃত্রিম জলাধারগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় সরকার এবং জনসাধারণকে একসাথে উদ্যোগী হতে হবে। এছাড়া শহরাঞ্চলে জল সাশ্রয় ও পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রযুক্তিগত সমাধান গ্রহণ করা হচ্ছে।

উরমিয়া হ্রদ, যার প্রতি ইরানের মানুষের ঐতিহাসিক ও সামাজিক সংযোগ রয়েছে, তার শুষ্ক অবস্থায় দেশীয় অর্থনীতিতে ও পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। লেকের পানি বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় পরিবেশেও পুনরুজ্জীবন ঘটবে, যা পরিসরের জীববৈচিত্র্য ও কৃষি উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের এই উদ্যোগ দেখায় যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি অন্য দেশে পানি সংকট মোকাবিলার জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ। তবে, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বৃষ্টি নামানো ও পরিবেশের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পরীক্ষা করা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত, ইরানের ক্লাউড সিডিং অভিযান জনগণকে আশার আলো দেখিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী খরা এবং কম বৃষ্টিপাতের ফলে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কিছুটা হলেও হ্রাস করার চেষ্টা চলছে। তবে এটি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ; দেশের পানির নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার জন্য আরও সংহত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই অভিযান প্রমাণ করছে, কঠিন প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতেও প্রযুক্তি এবং মানব উদ্যোগ মিলিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব। ইরান এই পদক্ষেপের মাধ্যমে শুধু খরার তীব্রতা হ্রাসের চেষ্টা করছে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে সুরক্ষা দেওয়ার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত