পেনাল্টি মিসে জয়ের সুযোগ হারিয়ে তিউনিসিয়ার সঙ্গে ড্র ব্রাজিলের

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪০ বার
পেনাল্টি মিসে জয়ের সুযোগ হারিয়ে তিউনিসিয়ার সঙ্গে ড্র ব্রাজিলের

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রীতি ম্যাচ হলেও মাঠে নামার আগে উত্তেজনার কোনো কমতি ছিল না। বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিল নামটি নিজেই এক আবেগ, আর প্রতিপক্ষ তিউনিসিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের শক্তি ও দৃঢ়তা দিয়ে সবার নজর কেড়েছে। তাই মঙ্গলবার রাতের ম্যাচটিকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা ছিল যথেষ্ট উচ্চতায়। আর সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন মিলেছিল মাঠের প্রতিটি মুহূর্তে—আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, উত্তেজনা, নাটকীয়তা, এবং অবশ্যই পেনাল্টি মিসের হতাশা—সব মিলিয়ে ম্যাচটি হয়ে ওঠে দারুণ রোমাঞ্চে ভরপুর।

ম্যাচ শুরু থেকে দুই দলই আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলতে থাকে। ব্রাজিল বল দখলে আধিপত্য দেখালেও গোলের মুখে শট নেওয়ার ক্ষেত্রে ছিল তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। তিউনিসিয়া শুরু থেকেই বুঝিয়ে দেয়, নাম বড় হলেও প্রতিপক্ষকে তারা ভয় পাচ্ছে না। দ্রুতগতির ট্রানজিশন, ডান-বাম থেকে উঠে আসা আক্রমণ এবং মাঝমাঠে বল আদায় করে এগিয়ে যাওয়ার নৈপুণ্যে ম্যাচের প্রথম ভাগেই চাপ সৃষ্টি হয় ব্রাজিলের ডিফেন্সে।

ম্যাচের ২৩ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যা পুরো স্টেডিয়ামকে বিস্মিত করে দেয়। তিউনিসিয়ার ফরোয়ার্ড হাজেম মাস্তুরি ব্রাজিলের ডিফেন্সের ভুলকে সুযোগে পরিণত করেন। বাম দিক থেকে এগিয়ে আসা একটি পাস ধরে তিনি দারুণ দক্ষতায় বল নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ডি-বক্সের ভেতর থেকে নিচু শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের ভেতর। ব্রাজিল গোলরক্ষক নিরুপায় হয়ে দেখলেন বল জালে ছুটে গেল। আকস্মিক সেই গোলে ম্যাচের গতি পাল্টে যায়, আর তিউনিসিয়ার ফুটবলাররা পেয়ে যান আত্মবিশ্বাসের বাড়তি জ্বালানি।

গোল হজমের পরেই ব্রাজিল আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এস্তেভোঁ, পাকেতা—সবারই গতিশীলতা চোখে পড়ার মতো ছিল। তিউনিসিয়ার ডিফেন্সও ছিল অনমনীয়, প্রতিটি আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই ব্রাজিল ম্যাচে সমতা ফেরানোর সুবর্ণ সুযোগ পায়। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার ব্রুনের হাতে বল লাগলে রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে যেতে বলেন, তবে ভিএআরের সহায়তায় তিনি পেনাল্টির ইশারা দেন। ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে তখন স্বস্তির এক ঢেউ।

ম্যাচের ৪৪ মিনিটে পাওয়া সেই পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসেন এস্তেভোঁ। তরুণ হলেও তার ঠান্ডা মাথা আর আত্মবিশ্বাস ছিল দর্শনীয়। তিনি ডান দিক বরাবর শক্ত শটে বল পাঠিয়ে সমতায় ফেরান দলকে। তিউনিসিয়ার গোলরক্ষক দিক অনুমান করলেও শট এতটাই নিখুঁত ছিল যে তিনি কোনোভাবেই ঠেকাতে পারেননি। ব্রাজিলের সমর্থকরা তখন ফের উল্লাসে ফেটে পড়েছেন, আবারও ম্যাচের দাপট নিজেদের করে নেওয়ার প্রত্যাশায়।

দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলই আরও বেশি সতর্ক কিন্তু আক্রমণাত্মক রূপে মাঠে নামে। ব্রাজিলের আক্রমণ বাড়তে থাকে প্রতি মিনিটেই। তিউনিসিয়ার ডিফেন্সও বারবার প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দিতে সক্ষম হয়। ব্রাজিল বল দখলে প্রায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলেও শেষ পর্যন্ত গোল আদায় করতে হিমশিম খায়। এর মাঝে তিউনিসিয়া মাঝেমধ্যেই পাল্টা আক্রমণে উঠে আসে, যা ব্রাজিলের ডিফেন্সকে কয়েকবার চাপে ফেলে।

ম্যাচের সবচেয়ে দুঃখজনক মুহূর্তটি আসে ৭৬ মিনিটে। ডি-বক্সে প্রবেশ করা ভিতো হকে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার ফাউল করলে রেফারি দ্বিতীয়বারের মতো পেনাল্টির নির্দেশ দেন। ব্রাজিলের গ্যালারিতে তখন উত্তেজনা টগবগ করছে। সবাই মনে করছিলেন, এবার হয়তো লিড নিয়ে ম্যাচের ফল নিজেদের করে নেবে সাম্বা শিবির। পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসেন অভিজ্ঞ লুকাস পাকেতা। তার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল ব্রাজিল এবার গোল পেতেই চলেছে।

কিন্তু ফুটবল যে অনিশ্চয়তার খেলা, তা আবারও প্রমাণ হলো এই মুহূর্তে। পাকেতার নেওয়া শট পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়। গোটা স্টেডিয়ামে নেমে আসে হতাশার ঢেউ। পাকেতার মুখে তখন কেবলই আক্ষেপ, হাত দিয়ে মাথা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। এদিকে তিউনিসিয়ার খেলোয়াড়রা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, তারা যেন নতুন করে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পান ম্যাচে টিকে থাকার।

বাকি সময়টায় ব্রাজিল প্রাণপণ চেষ্টা করেছে গোল পেতে। এস্তেভোঁ, ভিতো হক, ভিনিসিয়ুস—সবাইই একের পর এক আক্রমণ গড়ে তুলেছেন। কিন্তু তিউনিসিয়ার ডিফেন্স ভেঙে পড়ে না। গোলরক্ষকও ছিলেন দুর্দান্ত, বেশ কিছু শট তিনি দক্ষতার সঙ্গে রুখে দেন। শেষ মুহূর্তের বাড়তি চাপে দুই দলই কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তবুও ম্যাচের উত্তাপ কোনো অংশেই কমেনি।

অবশেষে নির্ধারিত সময় শেষে ১-১ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় ব্রাজিলকে। ম্যাচের পর ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি মুখে যদিও হতাশা লুকাতে পারেননি, তবুও তিনি দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে প্রশংসা করেছেন। আনচেলত্তি জানান, ম্যাচে ভুল ছিল, সুযোগ নষ্ট হয়েছে, কিন্তু দল সামগ্রিকভাবে ভালো খেলেছে। তরুণ খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ ফুটবলের ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে তিউনিসিয়া কোচ দলের লড়াকু মানসিকতাকে সর্বোচ্চ কৃতিত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে ড্র করাটাই বড় অর্জন, বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ দুটি পেনাল্টি পেয়েছিল।

ম্যাচটি শেষ হলেও আলোচনায় থাকবে আরও অনেকদিন। বিশেষ করে পাকেতার পেনাল্টি মিস, এস্তেভোঁর দুর্দান্ত দক্ষতা, তিউনিসিয়ার লড়াই—সব মিলিয়ে এক স্মরণীয় রাত কাটিয়েছে ফুটবলপ্রেমীরা। ব্রাজিল জিততে পারেনি ঠিকই, কিন্তু খেলায় যে উচ্ছ্বাস, নাটকীয়তা ও আবেগ ছিল, তা বিশ্বজুড়ে ফুটবলভক্তদের মনে রেখাপাত করেছে।

ফুটবল প্রেমীদের কাছে এটাই ফুটবলের সৌন্দর্য—অপ্রত্যাশিত নাটকীয়তা, ওঠা-নামা, এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তার লড়াই। এই ম্যাচও তার ব্যতিক্রম নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত