ভিয়েতনামে বন্যা ও ভূমিধসে মৃত্যু ৮, হাজার পরিবার ঝুঁকিতে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
ভিয়েতনামে বন্যা ও ভূমিধসে মৃত্যু ৮, হাজার পরিবার ঝুঁকিতে

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভিয়েতনামের মধ্যাঞ্চলে টানা ভারী বর্ষণের কারণে সৃষ্ট বন্যা এবং ভূমিধসে অন্তত আটজনের প্রাণহানি ঘটেছে। বুধবার (১৯ নভেম্বর) সরকারিভাবে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু মানুষের প্রাণহানিই ঘটায়নি, বরং মধ্যাঞ্চলের কৃষি ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের উপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কফি উৎপাদন এলাকায় বন্যা কৃষকদের সংগ্রহের মৌসুমে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার রাত থেকে মধ্য ভিয়েতনামের বিভিন্ন অঞ্চলে ১,১০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই অঞ্চলটি দেশটির প্রধান কফি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি। স্থানীয়দের মতে, বর্ষণের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে গ্রামীণ এলাকা থেকে শহরের কিছু অংশ পর্যন্ত জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে, এবং ভূমিধসের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে ছয়জন একটি বাসের যাত্রী ছিলেন। রোববার সন্ধ্যায় দা লাত থেকে না চ্যাং যাওয়ার পথে বাসটি একটি ভূমিধসের কবলে পড়ে। এছাড়া সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে তিনজন দা নাং এলাকায় ভূমিধসের নিচে চাপা পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারীরা নিখোঁজদের খোঁজে অভিযান চালাচ্ছে, তবে দুর্ঘটনার জটিল প্রকৃতির কারণে উদ্ধার তৎপরতা সীমিত হয়েছে।

মধ্যাঞ্চলের ডাক লাক প্রদেশের এক কফি ব্যবসায়ী বলেন, ‘ডাক লাক প্রদেশের নিচু এলাকাগুলো এখন গভীর বন্যার পানিতে ডুবে আছে। এতে কফি খামারের ফসলের বড় অংশ ধ্বংসের আশঙ্কা রয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ভারী বর্ষণের কারণে কৃষকরা কেবলমাত্র ১০–১৫ শতাংশ কফির কাঁচা বীচি সংগ্রহ করতে পেরেছেন। এছাড়া, শুকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সূর্যালোকের অভাব ফসলের গুণমানেও প্রভাব ফেলছে।

ভিয়েতনাম নিউজ এজেন্সি জানায়, বন্যার কারণে হাজার হাজার পরিবারকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। জিয়া লাই প্রদেশে বুধবার স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, ফলে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এবং বিপর্যস্ত শিশুদের নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা বুধবার আরও বন্যা এবং ভূমিধসের সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটি জানায়, অঞ্চলে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকবে এবং পূর্বাভাস অনুযায়ী আরও কয়েক দিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি তীব্র হতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন জনগণকে সাবধান থাকার নির্দেশ দিয়েছে এবং বিপর্যয়ের সময় সহায়তার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সরকারি ও স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে, মধ্যাঞ্চলের অনেক গ্রামে ঘরবাড়ি ছাদ পর্যন্ত পানিতে ডুবে রয়েছে। এদিকে বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে ঘর থেকে বের হতে পারছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, গ্রামবাসীরা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছেন, এবং উদ্ধারকারীদের দ্রুত কার্যক্রমের জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন।

উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা সতর্ক করেছেন, বন্যার কারণে কফি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কফি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। মধ্য ভিয়েতনামের কফি চাষীরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবে এই সময়ে তারা কফি সংগ্রহের কাজ শেষ করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করতে পারত। তবে এখন জলাবদ্ধতা এবং ভূমিধসের কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। উদ্ধারকারীরা প্লাবিত এলাকায় প্রবেশ করতে বিশেষভাবে নির্মিত নৌকা এবং যানবাহন ব্যবহার করছেন। এছাড়া, খাদ্য, পানি, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি সহায়তার প্যাকেজ বিতরণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি ত্রাণ তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্য ভিয়েতনামের মতো বন্যাপ্রবণ এলাকায় বর্ষণজনিত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সেচ ও জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ভূমিধস প্রতিরোধ, এবং স্থানীয় জনসাধারণকে দুর্যোগের জন্য সচেতন করা।

অপরদিকে, পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারী বর্ষণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে গ্রামীণ ও শহুরে অঞ্চল উভয়েই বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যাঞ্চলের নিম্নভূমি এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের সম্ভাবনা সবসময় থাকে। তারা বলছেন, পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা ও প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য।

মোটকথা, ভিয়েতনামের মধ্যাঞ্চলে এই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস শুধু জীবন-নাশের ঘটনা নয়, বরং কৃষি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় প্রভাব ফেলেছে। স্থানীয় প্রশাসন, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা একযোগে কাজ করছে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ নিরাপদে উদ্ধার ও পুনর্বাসন পেতে পারে। তবে চলমান বৃষ্টিপাত এবং ভূমিধসের ঝুঁকির কারণে বিপর্যয় পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। জনগণকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে।

এ ঘটনায় ভিয়েতনাম সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যক্রমও জোরদার হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং রেড ক্রসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বন্যা দুর্গত এলাকায় জরুরি মেডিকেল সহায়তা এবং খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে স্থানীয়দের জন্য স্বল্পমেয়াদে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত হচ্ছে।

এই দুর্ঘটনা মধ্য ভিয়েতনামের জন্য একটি বড় সতর্কতা বার্তা হিসেবে কাজ করছে। শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নয়, বরং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর 대응 নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত