প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
১৯৬৮ সালের ১৭ নভেম্বর পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শেখ হাসিনা। আজ ৫৮তম বিবাহ বার্ষিকীর দিনেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এই নিছকই কাকতালীয় নয়; ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভারতের নয়াদিল্লিতে বসেই তিনি বাংলাদেশের ক্ষমতার শীর্ষে আসার পথ তৈরি করেছিলেন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে প্রত্যাবর্তন করার আগে ভারতেই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এক সময়ের গৃহবধূ হিসেবে রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেছিলেন হাসিনা, কিন্তু আজ আন্তর্জাতিক আদালতের রায় তার রাজনৈতিক জীবনকে এক সম্পূর্ণ অন্য দিক দিয়ে চিহ্নিত করেছে। ইতিহাস যখন বিবেচনা করে, দেখা যায় ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। কোনো জাতীয় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও, বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচয় এবং পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাকে দলের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। তবে, এই পদোন্নয়নে দলের অভ্যন্তরে বিরোধও ছিল ব্যাপক।
সভাপতি পদে বসার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই দেশে এসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন ৩৩ বছর বয়সী হাসিনা। দলের অভ্যন্তরে নিজের বলয় প্রতিষ্ঠা করে একের পর এক ত্যাগী নেতাকে কোণঠাসা করা শুরু হয়। সৈয়দা জোহরা তাজ উদ্দিনসহ প্রভাবশালী নেতারা তার বলয়ের কারণে সাইডলাইনে চলে যান। দলের সভাপতির বিরুদ্ধে নেতাদের অবমূল্যায়ন, প্রতিপক্ষের অবহেলা এবং ব্যক্তিগত রাজনীতির কারণে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি জন্ম নেয়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ পায়।
হাসিনার রাজনীতির এই পর্যায়ে দেখা যায়, তার দিকনির্দেশে আওয়ামী লীগ একদিকে আন্দোলনের পথে এগিয়ে যায়, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হলেও, পরাজয়ের পর পুনরায় বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে যৌথ আন্দোলনে যুক্ত হন। এটি দেখায়, হাসিনা ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।
এরশাদের পতনের পর, ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার লক্ষ্যে প্রচারণা চালান তিনি। যদিও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে মাত্র ৮৮ আসনে জয়লাভ করে, তখনও তিনি রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় ছিলেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাচন কারচুপি হয়েছে, যদিও দেশটি ইতিহাসের মধ্যে অন্যতম স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিল।
হাসিনার শাসনামলের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয় বিচারিক হত্যাকাণ্ড এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। ২০১৪ সালের বিনাভোট নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নামে একাধিক জামায়াতে ইসলামী নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার শাসনামলে রাজনৈতিক ও মানবিক গণতন্ত্রের ন্যূনতম কাঠামোও ভেঙে পড়ে। বিএনপি, জামায়াত এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলোকে একের পর এক অবমূল্যায়ন করা হয়।
গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রতিষ্ঠান থেকে সরানো, সংবিধানে সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা, এবং নির্বাচনের অবাধ ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়া বাতিল করা – এসব ঘটনা দেশকে একটি একতরফা ও ভয়ঙ্কর শাসনের দিকে পরিচালিত করে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচন দেশের জনগণের কাছে “বিনাভোট” ও “ডামি ভোট” হিসেবে পরিচিত হয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ধ্বংস করা হয় ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন এবং অন্যান্য কালো আইনের মাধ্যমে। স্বৈরশাসনের এই শৃঙ্খল জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন এই প্রক্রিয়ার বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সহ প্রায় ১৪০০ জন প্রাণ হারায়। এই গণদাবির মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন হাসিনা এবং ভারতীয় রাজধানী নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নেন।
হাসিনার পালানোর পর তার দলের নেতারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়, অনেকেই গ্রেপ্তার হন, আর জনগণের ক্ষোভের মুখে তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও আগুনে ভস্মীভূত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভেঙে ফেলা হয় এবং ঐতিহাসিক ভবনগুলো ধ্বংস করা হয়।
বর্তমান সরকার ২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু করে। পালিয়ে যাওয়ার ১৫ মাস পরে, আন্তর্জাতিক আদালত হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম রায় ঘোষণা করে এবং গণহত্যার জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের এই সমগ্র ইতিহাস, তার শাসনামলের উত্থান ও পতন, এবং দেশের মানুষের প্রতিরোধ এক সাথে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, ক্ষমতার অতিপ্রাচুর্য কখনোই নিরাপদ থাকে না। ইতিহাস প্রমাণ করে, যা শুরু হয়েছিল ভারতের নয়াদিল্লিতে, তা আজ বাংলাদেশে তার শাস্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে।