মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ন্যায্য গ্রেড বাস্তবায়নে উত্তাল ময়মনসিংহ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪০ বার
মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ন্যায্য গ্রেড বাস্তবায়নে উত্তাল ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ময়মনসিংহে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের (এমটিএফ) দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নের আহ্বানে আবারও জোরালো আন্দোলনের দৃশ্য দেখা গেল। বুধবার সকাল থেকে প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠান থেকে আসা টেকনোলজিস্টরা মানববন্ধনে অংশ নেন। তাঁদের কণ্ঠে উঠে আসে তিন দশকের ক্ষোভ, বেদনা এবং অধিকার আদায়ের অটল প্রত্যয়। কথায় কথায় তাঁরা মনে করিয়ে দেন—জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার একেবারে মূলভিত্তির কাজটি তাঁরা করেন, কিন্তু প্রাপ্য সম্মান ও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা এখনও তাঁরা পান না।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের অবদান অনস্বীকার্য। রোগ নির্ণয়ের কাজে ল্যাবরেটরি টেস্ট থেকে শুরু করে এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, প্যাথলজি, ব্লাড ব্যাংক—এসব ক্ষেত্রেই তাঁদের দক্ষতা রোগীর সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা সরকারি বেতন কাঠামোর ১০ম গ্রেড পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তবুও দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে এক ধরনের গভীর ক্ষোভ ও হতাশা জন্ম নিয়েছে।

বক্তাদের মতে, করোনার সময় যখন সারা পৃথিবী থমকে ছিল, তখন হাসপাতালের ভেতর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। চিকিৎসকেরা যখন চিকিৎসা দিচ্ছিলেন, তার পেছনে সঠিক রিপোর্ট নিশ্চিত করতে দিন-রাত সমান তালে কাজ করেছেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। ডেংগুর প্রতিটি মৌসুমে তাঁরা প্রায় যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে কাজ পরিচালনা করেন। নিপাহ ভাইরাস ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবেও তাঁরা সামনের সারিতে থেকে জনগণের জীবনরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অথচ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে গ্রেড আপডেটের মতো একটি মৌলিক সুবিধা না পাওয়া তাঁদের কাছে এক গভীর বঞ্চনার মতো মনে হয়।

মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ময়মনসিংহ জেলা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ফোরামের সভাপতি শাকিল রানা বলেন, তাঁরা বহু বছর ধরে একই দাবি জানিয়ে আসছেন। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তাঁদের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁরা সবসময়ই অবহেলিত। তিনি আরও জানান, ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন হলে শুধু তাঁদের জীবনের মানই উন্নত হবে না, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের আরো অনুপ্রাণিত করবে, যা দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সিনিয়র সহ-সভাপতি শাহজাহান কবীর মানববন্ধনে বলেন, টেকনোলজিস্টরা সাধারণ কোনো কর্মী নন। তাঁদের ওপর নির্ভর করে সঠিক রোগ নির্ণয়, যা চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। উন্নত বিশ্বে এই পেশার মর্যাদা ও সুবিধা রয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশে তাঁরা সেই মর্যাদা থেকে বহু দূরে রয়ে গেছেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, অন্য পেশার তুলনায় টেকনোলজিস্টদের কাজ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তাঁরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সংক্রামক ও মারাত্মক রোগের নমুনা নিয়ে কাজ করেন। এ অবস্থায় তাঁদের গ্রেড উন্নয়ন শুধু কর্মীদের স্বার্থেই নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোর স্বার্থেও জরুরি।

মানববন্ধনে উপদেষ্টা শফিকুর রহমান বলেন, সরকার বারবার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তিনি আরও বলেন, যখন গ্রেড আপডেটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই টেকনিক্যাল পদের গুরুত্ব বিবেচনা করা হয় না। অথচ হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের কাজটি অত্যন্ত বিচক্ষণতা, দক্ষতা ও ঝুঁকির সম্মিলন। সুতরাং তাঁদের দাবিকে অযৌক্তিক বলার কোনো সুযোগ নেই।

এদিন মানববন্ধনে কর্মরত টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের মুখে একই সুর—তাদের জীবন, পরিবার, ভবিষ্যৎ সবকিছুই প্রভাবিত হয় এই গ্রেডের ওপর। বিশেষ করে নবীন প্রযুক্তিবিদরা বলেন, তাঁদের যোগ্যতা ও উচ্চ শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা সত্ত্বেও তারা যখন কাঙ্ক্ষিত গ্রেড থেকে বঞ্চিত হন, তখন পেশার প্রতি শ্রদ্ধা ও উৎসাহ কমে যায়। অনেকেই বিদেশে সুযোগ খুঁজতে বাধ্য হন, যার ফলে দেশের দক্ষ মানবসম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে।

মানববন্ধনে বক্তারা সতর্ক করে বলেন, যদি দ্রুততম সময়ে তাঁদের ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন না করা হয়, তবে তাঁরা সারাদেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হবেন। এতে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক সংকট তৈরি হতে পারে। হাসপাতালের ল্যাবরেটরি কার্যক্রম, ডায়াগনস্টিক সেবা, রক্ত পরীক্ষাসহ জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রম থমকে যেতে পারে। সাধারণ রোগী থেকে শুরু করে হাসপাতালের জরুরি ওয়ার্ড পর্যন্ত সবখানেই এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধন শুধু একটি জেলার দাবি নয়; বরং সারাদেশের মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ। মানববন্ধনের পুরো সময়জুড়ে অংশগ্রহণকারীরা এক ধরনের দৃঢ়তা এবং প্রত্যয়ের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের হাতে লেখা প্ল্যাকার্ডে ছিল পরিবার, ভবিষ্যৎ এবং ন্যায্য অধিকারের কথা।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক তরুণ টেকনোলজিস্ট বলেন, তাঁরা দেশের মানুষের সেবা করতে চান। কিন্তু নিজেদের মৌলিক অধিকার না পেলে সেই সেবা দিতে গিয়ে মানসিক চাপ অনুভব করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একই দাবিতে দাঁড়িয়ে থাকাটা শুধু কর্মীদের নয়, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্যও ক্ষতিকর। তাঁদের আশা, সরকার দ্রুত তাদের কথার গুরুত্ব বুঝবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

দিন শেষে টেকনোলজিস্টরা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন শেষ করেন, তবে তাঁদের চোখে ছিল দাবির বাস্তবায়ন না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতির বার্তা। ময়মনসিংহের মানববন্ধন আজ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে সামনে তুলে এনেছে—যেখানে কর্মীরা শুধু বেতন নয়, মর্যাদা, স্বীকৃতি এবং ন্যায্য অধিকারের লড়াই চালাচ্ছেন।

সরকারের ওপর এখন দায়িত্ব—এই জটিলতা দ্রুত সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত না হয় এবং যারা দিনরাত পরিশ্রম করে সেই ব্যবস্থা সচল রাখেন, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত