বিআরবিকে কোটি কোটি কর সুবিধা দেয়ায় কর্মকর্তার পদাবনতি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩১ বার
বিআরবিকে কোটি কোটি কর সুবিধা দেয়ায় কর্মকর্তার পদাবনতি

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুর কর অঞ্চলের উপ কর কমিশনার সাজিদ খানের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে প্রায় ১৮০ কোটি টাকার কর সুবিধা প্রদান করেছেন। বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ মঙ্গলবার প্রজ্ঞাপন জারি করে তার পদাবনতি করেছে, যা শৃঙ্খলা বিধিমালার ৪(২)(ঘ) ধারার আওতায় বিবেচিত হয়েছে। এই পদাবনতি অনুযায়ী, তার বেতন গ্রেডের এক ধাপ অবনমিত করা হয়েছে, যা ৪৫ হাজার ৩৩০ টাকা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

তদন্তের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সাজিদ খান খুলনা কর অঞ্চলের সার্কেল–১ কোম্পানিজে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৮–১৯ ও ২০১৯–২০ করবর্ষে যথাক্রমে ১৫১ কোটি টাকা কর ক্রেডিট এবং প্রায় ২৯ কোটি টাকা কর প্রত্যর্পণ সুবিধা প্রদান করেন। এই সুবিধা প্রদানে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই বা অনুমোদন গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ১৭৩ ধারায় সংশোধিত আইটি–৩০ অনুযায়ী ২০১৮–১৯ করবর্ষে ৩ কোটি ৩৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা এবং ২০১৯–২০ করবর্ষে ২৫ কোটি ৩৭ লাখ ২০ হাজার টাকার কর প্রত্যর্পণ তৈরি করা হয়। এসব লেনদেনের কোনো আইনানুগ অনুমোদন ছিল না, যা বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তোলে।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের তদন্তে দেখা গেছে, দুই করবর্ষে প্রতিষ্ঠানটির উৎসে কর্তিত কর যথাক্রমে ৬৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং ৮৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা—কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ক্রেডিট হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। এই অনিয়মের ফলে সরকারি তহবিলে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রশ্ন উঠেছে।

সাজিদ খানের বিরুদ্ধে ‘সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, ২০১৮’-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা পরিচালনা করা হয়। ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দাখিলের পর গত ১৩ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে শোনা হয় ব্যক্তিগত শুনানি। দীর্ঘ সময়ের পর্যালোচনার পর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ পদাবনতি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

বিভাগীয় সূত্র জানিয়েছে, কর কমিশনারের দায়িত্ব হলো দেশের কর ব্যবস্থা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা, যাতে সরকারী রাজস্ব সঠিকভাবে সংগ্রহ হয়। কিন্তু সাজিদ খানের ক্ষেত্রে নিয়মাবলির লঙ্ঘন এবং অনুমোদন ছাড়া বিপুল অর্থের কর সুবিধা প্রদানের ঘটনায় কর প্রশাসন ও সরকারের নীতি-নির্ধারক সংস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বিষয়টি নতুন করে প্রতিটি কর অঞ্চলের কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দিয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নিয়মানুগ কর্মকাণ্ড অতি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, সাজিদ খান তার দায়িত্ব পালনকালে যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানকে ক্রেডিট এবং কর প্রত্যর্পণ সুবিধা প্রদান করেছেন, যা শৃঙ্খলাভঙ্গের শাস্তির আওতায় পড়ে। এর ফলে তার পদ থেকে এক ধাপ অবনমিত করা হয়েছে এবং নির্ধারিত বেতন হ্রাস করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একাধিক কর বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন, দেশের কর প্রশাসনে এই ধরনের অনিয়ম শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতি ঘটায় না, বরং করদাতাদের মধ্যে বিশ্বাসও ক্ষুণ্ণ করে। কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ অপরিহার্য। সাজিদ খানের পদাবনতি এই প্রক্রিয়ারই অংশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ জনগণ এবং ব্যবসায়ীরা সরকারের কর নীতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর নজর রাখে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা বা নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত সরকারের নীতি বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে এবং দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।

বিভাগীয় সিদ্ধান্তে আরও বলা হয়, সাজিদ খানের এই অনিয়মের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সকল কর কর্মকর্তার মধ্যে সতর্কতা বৃদ্ধি করা হবে। ভবিষ্যতে এমন ধরনের লঙ্ঘন রোধ করার জন্য অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ও তদারকি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে। কর কমিশনারদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করলে আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

উল্লেখযোগ্য যে, এই ঘটনা দেশের কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা, নিয়ম-নীতি এবং দায়িত্বশীলতার গুরুত্বকে আরও প্রকটভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এবং কর প্রশাসন এই পদক্ষেপের মাধ্যমে অন্যান্য কর্মকর্তাদের সতর্ক করার পাশাপাশি দেশের কর রাজস্ব সঠিকভাবে সংগ্রহের গুরুত্বও পুনরায় রপ্ত করেছে।

সাজিদ খানের পদাবনতি নিয়ে রংপুর কর অঞ্চলের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন করদাতা প্রতিষ্ঠান মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। একদিকে কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে, অন্যদিকে সরকারি কর্তৃপক্ষের শৃঙ্খলা বিধিমালা অনুযায়ী পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মোটকথা, বিআরবি ক্যাবলকে কোটি কোটি টাকার কর সুবিধা প্রদানের ঘটনায় উপ কর কমিশনার সাজিদ খানের পদাবনতি দেশের সরকারি প্রশাসনের স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা এবং শৃঙ্খলা রক্ষার দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে। এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নিয়ম এবং তদারকি বাধ্যতামূলক, এবং সরকারের আর্থিক স্বার্থের জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত