দেশে দুই কোটির বেশি মানুষ সিওপিডিতে ভুগছেন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৯ বার
দেশে দুই কোটির বেশি মানুষ সিওপিডিতে ভুগছেন

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে ক্রনিক শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগ সিওপিডি বা ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজে ভুগছেন প্রায় দুই কোটি মানুষ। এই রোগ, যা ক্রনিক ব্রংকাইটিস, এমফাইসিমা এবং ক্রনিক অ্যাজমার মতো বিভিন্ন উপসর্গের সমন্বয়ে গঠিত, সাধারণভাবে অনেকের কাছে অ্যাজমা হিসেবে ভুলভাবে বোঝা হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, সিওপিডি এবং অ্যাজমা এক নয়। সিওপিডি হলো অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম, এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোকের পর এটি মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১২.৫ শতাংশ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই কোটি মানুষের সমান। বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়, শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি।

সিওপিডি হলো দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টজনিত রোগ। রোগের শুরুতে উপসর্গগুলো স্বল্পমাত্রায় প্রকাশ পায়, তাই অনেক রোগী বুঝতে পারেন না যে তারা আক্রান্ত। শ্বাসকষ্ট, হাঁচি-কাশি, বুকের ধাক্কা বা ক্লান্তি প্রাথমিক পর্যায়ে উপস্থিত হতে পারে, যা সাধারণ অসুস্থতার সঙ্গে মিলিয়ে ভুল বোঝা হয়। তবে চিকিৎসা ও সচেতনতার মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ধুমপান পরিহার, দূষণমুক্ত পরিবেশে বসবাস, মুখে মাস্ক ব্যবহার, ফুসফুসের পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ, সুষম খাদ্য গ্রহণ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ সনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে রোগীর জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা যায়।

বিশ্ব সিওপিডি দিবস ২০২৫ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৯ নভেম্বর) রাজধানীর এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকার রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত শ্বাসতন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা বিষয়ক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। সেমিনারে বিশেষভাবে বক্তারা সিওপিডি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার নানা দিক তুলে ধরেন।

বৈজ্ঞানিক সেশনে ‘Role of NIV in COPD’ বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকার রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. জিয়াউল হক। অন্যদিকে, ‘Surgical Management of COPD’ বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন থোরাসিক সার্জারির সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. শাহিনুর রহমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডা. ফয়সাল ও ডা. তিসা, এবং সমন্বয় করেন ডা. মাহফুজ আহমেদ চৌধুরী। বক্তারা বলেন, সিওপিডি প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, উন্নত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নিয়মিত চেক-আপ অপরিহার্য। এছাড়া, ধুমপান ত্যাগ, বাসস্থানের ধোঁয়া কমানো, সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া এবং নিয়মিত ফুসফুসের কার্যক্রম পরীক্ষা করা অপরিহার্য।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন এভারকেয়ার হসপিটালের সিইও ও এমডি ডা. রত্নদ্বীপ চাস্কার। তিনি বলেন, সিওপিডি একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা অগ্রহণযোগ্য হলে রোগীর জীবনমান দ্রুত নষ্ট করে। এরপর গ্রুপ ডিরেক্টর, মেডিকেল সার্ভিসেস ডা. আরিফ মাহমুদ বিশ্ব সিওপিডি দিবসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকার রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও চিফ কো-অর্ডিনেটর ডা. এস. এম. আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, অনেক রোগী জানেন না যে তারা সিওপিডিতে আক্রান্ত। এর ফলে তারা প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করতে ব্যর্থ হন, যা পরবর্তীতে রোগকে জটিল আকারে রূপান্তরিত করে।

ডা. মামুন আরও বলেন, সিওপিডি উপেক্ষা করলে জীবনমান দ্রুত কমে যায়। রোগ প্রতিরোধে নানান কার্যক্রমের মধ্যে ফুসফুসের পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় শারীরিক সক্ষমতা রক্ষা ও শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিকতা নিশ্চিত করতে ফুসফুস পুনর্বাসনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা অপরিহার্য। তিনি সচেতন করলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা হলে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ ও জীবনধারায় পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

সেমিনারে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. দেলোয়ার হোসেন এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ। বক্তারা মনে করিয়েছেন, সিওপিডি শুধু রোগের চিকিৎসা নয়, বরং এটি জনসচেতনতা বৃদ্ধিরও একটি প্ল্যাটফর্ম। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ধুমপান ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ফুসফুস পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।

সেমিনার থেকে উঠে আসে যে, সিওপিডি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ, হাসপাতাল ও চিকিৎসা সংস্থা, এবং জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বক্তারা সবাই একমত, রোগী ও পরিবারকে তথ্য প্রদান, পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সিওপিডি বিপুল জনসংখ্যার জন্য একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিওপিডির ঝুঁকি শুধুমাত্র ধুমপানকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রায়শই দূষিত পরিবেশ, খোলা চুলোর ধোঁয়া, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে দেখা দেয়। তাই গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশের মান উন্নয়ন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ অপরিহার্য।

সিওপিডি শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টের কারণে রোগীরা কর্মক্ষমতা হারান, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং পরিবার ও সমাজের উপর চাপ বাড়ে। তাই সঠিক চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা রোগীর জীবনমান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এভাবেই এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকার সেমিনারটি সিওপিডি প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। বক্তাদের মতে, জনসচেতনতা, প্রাথমিক চিকিৎসা, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ও ধুমপান ত্যাগ মিলিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে দেশের দুই কোটিরও বেশি মানুষ এই রোগ থেকে সুরক্ষা পেতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত