মুশফিকের শততম টেস্টে ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭২ বার
মুশফিকের শততম টেস্টে ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি: বিশ্ব ক্রিকেটের এলিট ক্লাবে বাংলাদেশের ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে আজকের দিনটি চিরস্মরণীয় হয়ে রইল। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটার মুশফিকুর রহিম শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলকই স্পর্শ করেননি, বরং এনে দিয়েছেন এক অনন্য সম্মান। দেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে শততম টেস্ট খেলার গৌরব অর্জনের পর শততম ম্যাচেই দুর্দান্ত সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে তিনি প্রবেশ করলেন বিশ্ব ক্রিকেটের সেই এলিট ক্লাবে, যেখানে তার আগে ছিলেন মাত্র ১০ জন কিংবদন্তি ক্রিকেটার। ১৪৮ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এই সাফল্য তাই বিশেষ মর্যাদা বয়ে আনল বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য।

মিরপুরের গ্যালারিতে বৃহস্পতিবারের সকালটা ছিল উৎসবের মতো। মাঠে প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই দর্শকের করতালি, প্ল্যাকার্ড এবং সমর্থকদের ভালোবাসা যেন বয়ে আনছিল এক আবেগঘন পরিবেশ। শততম টেস্ট খেলতে নামা মুশফিক ছিলেন দিনের শুরু থেকেই বিশেষ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আগের দিন ৯৫ রানে অপরাজিত থেকে ফিরেছিলেন তিনি। তাই দ্বিতীয় দিনের খেলায় শুরুতেই সবাই তাকিয়ে ছিল মুশফিকের দিকে, কখন আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত সেঞ্চুরির মুহূর্ত।

দিনের প্রথম ওভারে তিনি সতর্ক ও সংযত ছিলেন, প্রতিটি বল দেখে-শুনে খেলেছেন। উদ্বেগ নয়, বরং ছিল আত্মবিশ্বাস—যে আত্মবিশ্বাস বহন করে একজন পরিপক্ব টেস্ট ব্যাটার। আর দিনের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম দিকেই এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নিখুঁত টাইমিংয়ে খেলা শট বলটা সীমারেখা পার করতেই উল্লাসে ফেটে পড়ল পুরো মিরপুর। ৯৫ থেকে শতক—মাত্র কয়েক মিনিটের অপেক্ষা, কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য তা হয়ে উঠল অমূল্য এক স্মৃতি। ব্যাট উঁচিয়ে প্রথাগত উদযাপন করলেন মুশফিকুর রহিম, আর সতীর্থদের মাঝেও ছড়িয়ে গেল গর্বের হাসি।

মুশফিকের ১৩তম টেস্ট সেঞ্চুরিটি নিঃসন্দেহে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বিশেষ ইনিংস। শুধু রান নয়, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মাইলফলক অর্জনের মাহাত্ম্য। এর আগেও তিনি ১২টি সেঞ্চুরিকে করেছেন অসাধারণ, যার তিনটিই পরিণত করেছিলেন ডাবল সেঞ্চুরিতে। কিন্তু আজকের শতকটি বিশেষত্বে উজ্জ্বল, কারণ তা এসেছে নিজের শততম টেস্টে—যা ক্রিকেট ইতিহাসে খুব কম ব্যাটারই করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।

এই রেকর্ডে প্রথম নাম লেখান ১৯৬৮ সালে ইংল্যান্ডের কলিন কাউন্ড্রে, শততম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে। এরপর ১৯৮৯ সালে ভারতের বিপক্ষে শততম টেস্টে সেঞ্চুরি করেন পাকিস্তানের জাভেদ মিয়াঁদাদ। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৪৯ রানের অনন্য ইনিংস খেলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ওপেনার গর্ডন গ্রিনিজ। সময়ের পরিক্রমায় এই তালিকায় যুক্ত হতে থাকেন আরও কয়েকজন তারকা ক্রিকেটার—ইংল্যান্ডের আলেক স্টুয়ার্ট, পাকিস্তানের ইনজামাম-উল-হক, দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রায়েম স্মিথ, হাশিম আমলা এবং অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নার। এর মধ্যে সবচেয়ে অনন্য কীর্তিটি রিকি পন্টিংয়ের, যিনি শততম টেস্টেই দুই ইনিংসে দুটি সেঞ্চুরি করে অজেয় এক নজির গড়েছিলেন।

আরও বিশেষ দুই নাম ইংল্যান্ডের জো রুট এবং অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটার ওয়ার্নার, যারা নিজেদের শততম টেস্টে করেছেন ডাবল সেঞ্চুরি। ২০২১ সালে ভারতের বিপক্ষে চেন্নাইয়ে ২০০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন রুট। ২০২২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২০০ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন ওয়ার্নার।

এই লেজেন্ডদের পাশে আজ বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিমের নাম যুক্ত হলো সগর্বে। দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে যা নিছক তথ্য নয়, বরং আবেগ, গৌরব এবং স্বপ্ন পূরণের অনুভূতি।

মিরপুরের উইকেটটি গত কয়েক বছর ধরে ব্যাটসম্যানদের জন্য ততটা অনুকূল না হলেও মুশফিকের ইনিংসে ছিল এক অনন্য ধৈর্য, টেকনিক আর সংযম। ম্যাচ পরিস্থিতির চাপও সামলে তিনি যেভাবে ব্যাটিং করেছেন, তাতে প্রকাশ পেয়েছে তার অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ব্যাটার হিসেবে আজ তিনি আরও উচ্চতায় পৌঁছে গেলেন। বিভিন্ন সময়ে দলের কঠিন মুহূর্তে ভরসা হয়ে উঠেছেন তিনি, তাই তাকে ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ বলা হয় অযথা নয়।

মুশফিকের শততম টেস্ট উপলক্ষে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও আয়োজন করেছে নানা সম্মাননা। খেলার বিরতিতে মাঠের বড় পর্দায় দেখানো হয়েছে তার ক্যারিয়ারের নানা স্মরণীয় মুহূর্ত। সতীর্থরা একে একে এসে তাকে শুভেচ্ছা জানাতে ভুল করেননি। ড্রেসিংরুমেও ছিল উৎসবের সুর—যা বোঝাচ্ছিল, মুশফিক শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং এই দলের ইতিহাস ও মেরুদণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এই সেঞ্চুরির ভিতর রয়েছে আরও বড় বার্তা। টেস্ট ক্রিকেটে যে ধৈর্য, নিষ্ঠা ও মানসিক দৃঢ়তা প্রয়োজন, তা মুশফিকের ক্যারিয়ারে বরাবরই দেখা গেছে। আর আজকের ইনিংস যেন সেই মূল্যবোধকে আরও একবার সামনে এনে দাঁড় করাল। ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এই ব্যাটার অসংখ্য ম্যাচে লড়াই করে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন। সবার সামনে নিয়মিত ঘাম ঝরিয়ে শেখানো হয়েছে কীভাবে একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদের জীবন চলা উচিত।

আজকের শতক শুধু রেকর্ড নয়, বরং বাংলাদেশ ক্রিকেটের দীর্ঘ যাত্রাপথে আরেকটি আলোকিত অধ্যায়। এই সেঞ্চুরি তরুণ ক্রিকেটারদের অনুপ্রেরণা দেবে—যে নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো শিখর স্পর্শ করা সম্ভব। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে যারা উজ্জ্বলতম তারা হবেন, নিঃসন্দেহে মুশফিকুর রহিম তাদের একজন, হয়তো সেরা দু-তিনজনের তালিকায়ও তার নাম থাকবে।

শেষ পর্যন্ত এই সেঞ্চুরি হয়ে থাকল সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া এক নিখুঁত রূপকথা। একজন ক্রিকেটারের শততম ম্যাচে সেঞ্চুরি—একে তো বিরল, তার ওপর সেই অর্জন বাংলাদেশ জাতীয় দলে, মিরপুরের মাঠে, দেশের মানুষের সামনে। এই বিশেষ অর্জন তাই লাখো সমর্থকের হৃদয়ে নতুন করে গর্ব, ভালোবাসা ও আবেগ জাগিয়ে তুলেছে।

বিশ্ব ক্রিকেটের এলিট তালিকায় এখন বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিম—এটি শুধু তার সাফল্য নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সাফল্য। ম্যাচ শেষ হোক বা না হোক, আজকের দিনটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে, আর মুশফিকের এই মহাকাব্যিক ইনিংস মনে করিয়ে দেবে নিষ্ঠা, আবেগ ও দৃঢ়তা থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com