স্বচ্ছ ভোট নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ব্যবহারের দাবি জোরালো হচ্ছে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৯ বার
স্বচ্ছ ভোট নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ব্যবহারের দাবি জোরালো হচ্ছে

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্নটি বহু বছর ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। নির্বাচনকে ঘিরে সংঘাত, সহিংসতা, প্রাণহানি এবং সহাবস্থানের সংকট যে কত বড় অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতি ডেকে আনে, সে বিষয়টি সাম্প্রতিক দুই দশকের অভিজ্ঞতায় আরও স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা থামাতে এবং নির্বাচনকে জনমানুষের বিশ্বাসযোগ্য করার প্রশ্নটি আজ নতুন করে সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষজ্ঞ মহল এবং বিভিন্ন নাগরিক গোষ্ঠীর আলোচনায় যে দাবি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, তা হলো দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থায় সিসিটিভি বা ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা।

এ দাবি নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ঘটনা এ দাবিকে আরও জোরালো করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন নির্বাচনে অনিয়ম, কেন্দ্র দখল, সহিংসতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ এসেছে বারবার। এসব অভিযোগের সঙ্গে সহিংস ঘটনায় প্রাণহানি, আহতের সংখ্যা এবং সম্পদের অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি যুক্ত হয়েছে। দেশের নির্বাচনি পরিবেশ প্রতিবারই উত্তাপ ছড়িয়েছে, যা বহু মানুষের জীবনে শোক, ভুক্তভোগিতা এবং অনিশ্চয়তা ডেকে এনেছে। এই দীর্ঘ অস্থিরতার পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে অনেকেই অস্বচ্ছ ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের কথা উল্লেখ করেন।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের গণতন্ত্র সুদৃঢ় হতে হলে নির্বাচন হতে হবে স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণের আওতায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, নানা সংস্কার প্রস্তাব, আইন সংশোধন কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করেও দেশের নির্বাচনি প্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত আস্থার জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন বা বিধি-নিষেধ আরোপ করলেই হবে না; বরং প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যা ভোটার, প্রার্থী, পর্যবেক্ষক, নির্বাচন কর্মকর্তা—সবার কাছে প্রক্রিয়াটিকে দৃশ্যমান ও স্বচ্ছ করে তুলবে।

এই প্রেক্ষাপটে সিসিটিভি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলে ভোট গ্রহণের সময়কার প্রায় সব কার্যক্রমই রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা বাধার আগেই তা চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে ভোট শেষে সেই ভিডিও রেকর্ড নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে, যা কোনো অভিযোগ উঠলে আইনি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

তবে এত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি ব্যবহারে এখনো কিছু জটিলতা রয়েছে বলে জানা গেছে। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সিসিটিভি স্থাপনের বিষয়ে ইতিবাচক মত থাকলেও প্রশাসনিক পর্যায়ে কখনো কখনো ব্যয়ের প্রশ্ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কিংবা কার্যকারিতা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। অনেকেই মনে করেন, এসব অনীহা বা আপত্তির পেছনে দক্ষতা ঘাটতি যেমন থাকতে পারে, তেমনি কখনো দ্বিধা–সংকোচ বা সিদ্ধান্তহীনতাও ভূমিকা রাখতে পারে। যে কারণেই হোক, একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারে বিলম্ব মানে আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র ও দুই লাখের বেশি বুথ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে প্রায় ছয়টি বুথ থাকে। যদি প্রতিটি বুথ ও কেন্দ্রকে সিসিটিভির আওতায় আনা হয়, তবে ব্যয় প্রায় ২০০ থেকে ২১৫ কোটি টাকার মতো হবে। একটি রাষ্ট্রের জন্য নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল প্রক্রিয়া হওয়ায় এই ব্যয়কে অনেকে যৌক্তিক বিবেচনা করেন। যেখানে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে, সেখানে একটি জাতীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের ব্যয় অতিরিক্ত নয়, বরং অত্যাবশ্যক।

যেসব প্রতিষ্ঠানে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়, সেসব স্থাপনায় সাধারণত বিদ্যুৎ সংযোগ থাকে। ফলে সিসিটিভি স্থাপন প্রযুক্তিগতভাবে খুব জটিল নয়। এমনকি দেশের অধিকাংশ জেলায় আইপি ক্যামেরা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সহজলভ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময় পেলেই সারা দেশে সিসিটিভি স্থাপন সম্ভব, যদি প্রশাসনের সদিচ্ছা ও নির্বাচনি পরিকল্পনায় প্রযুক্তির গুরুত্বকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকদের একাংশ প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন, সিসিটিভি স্থাপন মতো প্রযুক্তিগত সমাধান গ্রহণ করতে আপত্তির কারণ কী। অনেকেই মনে করছেন, সিসিটিভির উপস্থিতি ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে নির্ভুল নাও করতে পারে; কিন্তু এটি অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার সুযোগ অনেকটাই কমিয়ে দেবে। পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মূল চাবিকাঠি হলো স্বচ্ছতা, আর সিসিটিভি বহু পর্যবেক্ষকের মতে সেই স্বচ্ছতার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।

এদিকে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে একমত। কিন্তু কমিশন সচিবালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা এতে আপত্তি জানিয়েছেন। তার যুক্তি বা অসুবিধা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো না হলেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যারা দায়িত্ব পালন করেন, তাদের প্রত্যেকের দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো কর্মকর্তার অক্ষমতা বা অনীহার কারণে পুরো নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলে আসছেন, সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নিলে তার ক্ষতি বহুগুণে বাড়ে। নির্বাচন মাত্র একটি দিন বা একটি প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নির্ধারণ করে। প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি স্থাপন সেই ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। যদি এটি বাস্তবায়ন না হয়, তবে অভিযোগ, সহিংসতা, অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক অস্থিরতার চক্র আবারও ফিরে আসতে পারে। তাই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর এখন নির্ভর করছে আগামী নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোন পথে এগোবে।

সর্বোপরি, একটি স্বচ্ছ নির্বাচন দেশের জনগণকে আস্থা ফিরিয়ে দেয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধুই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন। সময়ই বলে দেবে, এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণে কতটা দূরদর্শিতা দেখাতে পারে নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত