পেঁয়াজের দাম বাড়ায় সীমিত আমদানির সিদ্ধান্ত ভাবছে সরকার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১০৭ বার
পেঁয়াজের দাম বাড়ায় সীমিত আমদানির সিদ্ধান্ত ভাবছে সরকার

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বছরের শেষ প্রান্তে এসে দেশের বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এক মাসের ব্যবধানে এর দাম কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। এতে ভোক্তা সাধারণের ওপর চাপ বাড়ে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় এ নিয়ে উদ্বেগ ও অসন্তোষ। যদিও গত কয়েক দিনে পাইকারি বাজারে সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় দাম সামান্য কমতে শুরু করেছে, তবে খুচরা বাজারে এখনো সেই সুবিধা ভোক্তারা পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিতে বাজার স্থিতিশীল করতে এবং বাড়তি চাহিদা মোকাবিলায় সরকার সীমিত পরিসরে পেঁয়াজ আমদানির কথা বিবেচনা করছে বলে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সূত্রে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম গণমাধ্যমকে জানান, পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার সক্রিয়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়তে থাকায় সীমিত পরিমাণে আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া পেঁয়াজ আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশে পৌঁছানো শুরু করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তবে সমুদ্রপথে আমদানির অনুমতি নেওয়া অনেক প্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহের আগে দেশে পণ্য আনতে পারবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।

বেনাপোল স্থলবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক মো. আবু তালহা জানান, পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা এখনো তার কাছে নেই। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ সিদ্ধান্ত ছাড়া এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এই দুই মন্ত্রণালয়ের আলোচনার ওপরই এখন মূলত নির্ভর করছে পরবর্তী সিদ্ধান্ত।

গত ৯ নভেম্বর বাণিজ্য উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাজারে পেঁয়াজের দাম এক সপ্তাহের মধ্যে না কমলে আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে। তার এমন বক্তব্যের পর বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেলেও দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। পাইকারি বাজারে সরবরাহ বেড়ে সামান্য কমলেও রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে পেঁয়াজ এখনো ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ অবস্থায় দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার আমদানির বিষয়ে আবারও গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে আমদানির পরিমাণ সীমিত রাখার বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত রয়েছে, যাতে স্থানীয় কৃষকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়।

এ নিয়ে কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চলমান টানাপোড়েন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, স্থানীয় কৃষকরা যখন বাজারে পেঁয়াজ ছাড়ছেন, তখন হঠাৎ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সীমিত পরিমাণে হলেও আমদানি অত্যাবশ্যক। তবে এখনো কৃষি মন্ত্রণালয় কোনো আইপি বা আমদানি অনুমতিপত্র দেয়নি। তাদের অনুমতি ছাড়া আমদানি কার্যত অসম্ভব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আমদানির ওপর চাপ থাকলেও কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি প্রধান বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। তার ভাষায়, বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে আছে এবং সিদ্ধান্ত আসতে আরও সময় লাগতে পারে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. জামাল উদ্দীন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে পেঁয়াজের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। কৃষকেরা বাজারে পেঁয়াজ ছাড়ায় সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে আসছে। তিনি আশা করেন, কয়েক দিনের মধ্যে দাম আরও কমে আসবে। আগামী ডিসেম্বরের শুরুতে নতুন পেঁয়াজ বাজারে এলেই দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে। তবুও আমদানির জন্য তাদের দপ্তরের ওপর চাপ রয়েছে এবং বিষয়টি এখনো দুই মন্ত্রণালয়ের আলোচনার মধ্যেই সীমিত।

দেশে পেঁয়াজ আমদানির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একসময় প্রতিবছর ১০ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ আমদানি হতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্থানীয় উৎপাদন বাড়ায় সেই পরিমাণ অর্ধেকে নেমে আসে। গত দুই অর্থবছরে আমদানির হার আরও কমে গেছে। সরকারের নীতি ছিল স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদন বাড়ানো এবং তাদের লাভজনক অবস্থানে রাখা। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আমদানির অনুমতি স্থগিত ছিল। কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠান আইপি আবেদনের অপেক্ষায় থাকলেও সরকার সায় দেয়নি। ফলে চলতি মৌসুমে দীর্ঘ সময় পেঁয়াজ লাভজনক দামে বিক্রি হয়েছে এবং বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল।

গত এক মাস আগে প্রতি কেজি পেঁয়াজ পাইকারিতে ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও সরবরাহ কমতে শুরু করলে দাম বেড়ে যায়। এরই মধ্যে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে—এমন খবরে বাজারে নতুন গতি তৈরি হয়েছে। দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই ভারতীয় পেঁয়াজ দেশে প্রবেশ শুরু করবে। সেই পূর্বাভাসেই পাইকারি বাজারে ব্যবসায়ীরা দাম ১০ টাকা পর্যন্ত কমিয়েছেন। তবে খুচরা বাজারে এর প্রভাব এখনো দেখা যায়নি।

রাজধানীর অন্যতম বড় পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারের আড়তগুলোর সাম্প্রতিক অবস্থা অনুসারে, দেশি পেঁয়াজের দাম আকার ও মানভেদে ৯৫ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছিল। এক মাসের ব্যবধানে খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল, যা ভোক্তা সাধারণের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। গতকাল দাম কিছুটা কমে মানভেদে ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও তাতে সাধারণ মানুষের খুব একটা স্বস্তি ফেরেনি।

পেঁয়াজের বাজার স্বভাবতই স্পর্শকাতর। মৌসুমভেদে উৎপাদন কমে গেলে অথবা সরবরাহ ব্যাহত হলে এর মূল্য হঠাৎ উর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে। এর প্রভাব পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর, কারণ পেঁয়াজ দৈনন্দিন রান্নার অন্যতম প্রধান উপাদান। ফলে এর দাম বেড়ে গেলে পরিবারিক ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সরকার তাই এ পণ্যের বাজার সবসময়ই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখে। বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক চাপও তৈরি হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সচেষ্ট হয়েছে, তা বিশ্লেষকদের মতে ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে স্থানীয় কৃষকদের স্বার্থ ও ভোক্তাদের স্বস্তি—দুটি ক্ষেত্রই সমানভাবে বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে। সীমিত পরিমাণে আমদানির ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে, দাম কমবে, আবার স্থানীয় কৃষকও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবেন না—এমন সমন্বিত সিদ্ধান্তই এখন দেশের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন।

অবশেষে সব নজর এখন সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তে। বাজার পরিস্থিতি কোনদিকে গড়াবে, দাম কতটা কমবে এবং নতুন মৌসুমের পেঁয়াজ বাজারে এলে স্থিতিশীলতা কতটা ফিরবে—তা জানা যাবে আগামী কয়েক সপ্তাহেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত