আদালত স্থির করল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার্যকর হবে পরবর্তী সংসদ থেকে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
আদালত স্থির করল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার্যকর হবে পরবর্তী সংসদ থেকে

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে পুনর্বহাল করেছে আপিল বিভাগ। বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ রায় ঘোষণা করে, যা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করেছে। আদালত জানিয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হবে চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনের পর।

এই রায়ের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হলো। দীর্ঘদিন ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার স্বতঃস্ফূর্ততা ও কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছিল। আপিল শুনানির সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। গত ১১ নভেম্বর শেষ হওয়া শুনানিতে বদিউল আলমের পক্ষে ছিলেন ড. শরীফ ভুইয়া, বিএনপির পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার জয়নুল আবেদীন এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

শুনানিতে অংশ নেওয়া আইনজীবীরা রায়কে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, বর্তমান অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। বদিউল আলমের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয় যে, সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সময়কাল সীমিত, এবং বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ রয়েছে। জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনিরও বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এসেছে, কিন্তু ফেব্রুয়ারির নির্বাচন চলতি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ ভাঙার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান সংবিধান অনুসারে রয়েছে। এখন সংসদ নেই, তাই তা প্রযোজ্য নয়। দেশের প্রশাসন বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এবং তাদের তিনটি ম্যান্ডেট—বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন—এর আওতায় আসন্ন নির্বাচন সম্পন্ন হবে। নতুন সংসদ গঠনের পর চাইলে আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা যেতে পারে, অথবা প্রয়োজনীয় নতুন কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।”

বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ এবং তা আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য কার্যকর হবে। এই রায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন দিক নির্দেশ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি শুধু নির্বাচনী কাঠামোর পরিবর্তন নয়, বরং ভবিষ্যতের নির্বাচনী পরিবেশে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে।

এর আগে, ২০১১ সালের ১০ মে বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেছিল। সেই রায়ের পরপরই ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তিসহ পঞ্চদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয় এবং ৩ জুলাই তা অনুমোদন করা হয়। তবে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানোর পথ তৈরি হয় গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পর। ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করে রায় দেন। এই রায়ের পরই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বহালের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়।

সাম্প্রতিক আপিল শুনানি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সংলাপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল শুনানিতে বলেছেন, “আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে হবে না। আমরা আদালতে জানিয়েছি, পরবর্তী নির্বাচন থেকে এই বিধান কার্যকর হতে পারে।” এই মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি স্পষ্ট দিক নির্দেশ করছে।

শুনানিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অংশ নেন ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, অ্যাডভোকেট মহসীন রশিদ ও ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক। ২১ অক্টোবর শুরু হওয়া আপিল শুনানি চলাকালীন উভয় পক্ষই যুক্তি উপস্থাপন করেন, যা রায়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

এবারের রায় প্রমাণ করে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কোনো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং সংবিধানের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে প্রজ্ঞাপনকৃত একটি কাঠামো। বিচার বিভাগ বলেছে, চলতি সংসদ নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্পন্ন হবে, যা দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। একই সঙ্গে, ভবিষ্যতে নতুন সংসদ গঠনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রয়োগের পথও উন্মুক্ত থাকবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রায় দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচনী পরিবেশের স্বচ্ছতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের পর এই রায় যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানগত বৈধতা দিয়েছে, তা জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি দেশের জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছ সংলাপের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

সর্বশেষে বলা যায়, আপিল বিভাগের এই রায় দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য যুগান্তকারী। চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হলেও, ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বহাল নিশ্চিত করছে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজের জন্য এটি নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত