প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় একটি বড় গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে আগুন লেগে অন্তত পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে প্রেরণ করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, কালিয়াকৈরের রাখালিয়াচালা এলাকার মোতালেব ওয়ার্কশপে কাজ করার সময় একটি বড় গ্যাস সিলিন্ডার থেকে হঠাৎ লিকেজ শুরু হয়। গ্যাসের দুর্গন্ধ দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ার পর পাশের চায়ের দোকানেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে অগ্নি পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। মোতালেব ওয়ার্কশপের মালিক মোতালেব হোসেন, চায়ের দোকানদার আলী হোসেন, এবং দোকানে বসা সফিকুল ইসলাম ও শামীম আহমেদ এবং শাহিন দগ্ধ হন।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা সঙ্গে সঙ্গে দগ্ধদের উদ্ধার করে তানহা হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর দেখা যায়, দুজনের অবস্থা গুরুতর। এরপর তাদের ঢাকার সবচেয়ে বড় বার্ন ইউনিটের হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দগ্ধদের বিভিন্ন অংশে তীব্র আগুনের আঘাত এবং শ্বাসনালি ও ত্বকের জ্বালা গুরুতর। চিকিৎসা চলাকালীন তাদের অবস্থা ক্রমশ মনিটরিং করা হচ্ছে।
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুন জানান, দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ছিল গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজ। তিনি বলেন, “মোটালেব ওয়ার্কশপে কাজ চলাকালীন বড় সিলিন্ডার থেকে হঠাৎ গ্যাস বের হতে থাকে। পাশের চায়ের দোকানে আগুন ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই দগ্ধের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের দ্রুততা এবং ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।”
স্থানীয়রা জানান, ওয়ার্কশপ এবং চায়ের দোকান খুব ঘনবসতি অঞ্চলে অবস্থান করছে। এটি একটি ছোট পাড়ার মধ্যে, যেখানে রাতের বেলা মানুষজন চা খেতে এবং ছোট ছোট ব্যবসা চালাতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত লোকালয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হয়। অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে চারপাশ থেকে সরে যান, কিন্তু দগ্ধদের তত্ক্ষণাত উদ্ধার করা হয়।
মোতালেব হোসেন, যিনি ওয়ার্কশপের মালিক, পুলিশকে জানান, তিনি সিলিন্ডারটি ঠিকমতো পরীক্ষা করে ব্যবহার করেছিলেন, তবে হঠাৎ লিকেজ শুরু হয়। “আমি কখনোই ভাবিনি এমন ঘটনা ঘটবে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, পাশের চায়ের দোকানের লোকেরা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম,” তিনি বলেন।
চায়ের দোকানদার আলী হোসেনও ঘটনার বিবরণ দেন, “আমি দোকানে চা বিক্রি করছিলাম। হঠাৎ গ্যাসের দুর্গন্ধ আসে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আমরা চিৎকার করতে করতে বাইরে বের হই। মোতালেব ভাই এবং অন্যরা দগ্ধ হন। স্থানীয়রা সাহায্য করতে আসে, না হলে আরও বড় বিপর্যয় ঘটতে পারত।”
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ ছিল সিলিন্ডারের তাপ এবং পাশে থাকা দগ্ধযোগ্য বস্তু। তাদের দ্রুত রেসপন্সে ওয়ার্কশপের ধ্বংস রোধ করা সম্ভব হয়েছে, তবে চায়ের দোকান ও ওয়ার্কশপের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতে গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার ও সংরক্ষণে আরও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ প্রায়ই বড় অগ্নিকাণ্ডের কারণ হয়ে থাকে। নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না হলে এমন দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি থাকে। স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদেরও সচেতন হতে হবে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, এই দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হয়নি, কিন্তু দগ্ধদের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকরা বলছেন, তাদের ত্বক ও শ্বাসনালীর ক্ষত দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সঠিক কারণ জানতে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যৌথ তদন্ত শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সিলিন্ডারের পুরাতন হওয়া এবং ব্যবহার করার সময় নিরাপত্তা বিধি অমান্য করা এ দুর্ঘটনার মূল কারণ। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে গ্যাস সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
স্থানীয়রা জানান, এই দুর্ঘটনা পাড়ায় আতঙ্ক তৈরি করেছে। রাতের সময় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন আগুন দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে। তারা আশা করছেন, দগ্ধদের দ্রুত ও সম্পূর্ণ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। স্থানীয়দের সচেতনতা ও তৎপরতার কারণেই বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এই দুর্ঘটনা দেশের ছোট শহর ও গ্রামের এলাকায় গ্যাস ব্যবহারের ঝুঁকির কথাও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির ব্যবহারকারীকে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে সতর্ক ও নিয়ম মেনে চলা জরুরি। নিয়মিত পরীক্ষা, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং জরুরি অবস্থা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিলে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সর্বশেষ, কালিয়াকৈরের এই ঘটনা পুনরায় প্রমাণ করছে যে, সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দগ্ধদের তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা ও স্থানীয়দের তৎপরতা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেছে। তবে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এমন দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন।