শিবচরে ইউএনও’র বার্তা: গেম নয়, নিয়ম মেনে বিদেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪১ বার
শিবচরে ইউএনও’র বার্তা: গেম নয়, নিয়ম মেনে বিদেশ

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাদারীপুর জেলার শিবচরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের উদ্যোগে আয়োজিত এক কর্মশালায় শিবচরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান অভিবাসন প্রক্রিয়া ও যুবসমাজকে নিরাপদ বিদেশ যাত্রার জন্য সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, গেম বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচলিত ভুল তথ্যের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়া মানে জীবন বিপন্ন করা। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় ইতিমধ্যেই অনেকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি সবাইকে সচেতন হয়ে সঠিক পথে বিদেশ যাত্রার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।

বুধবার (১৯ নভেম্বর) উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এই কর্মশালায় তিনি বলেন, “যারাই বিদেশ যেতে চায়, তারা সঠিক তথ্য জানার পরেই সিদ্ধান্ত নিক। যে কোনো মূল্যে এই মৃত্যুযাত্রা বন্ধ করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো যুবসমাজকে নিরাপদ পথে বিদেশে পাঠানো। এটা শুধু সরকারি নীতি নয়, বরং প্রতিটি পরিবারেরও দায়িত্ব।” ইউএনও আরও বলেন, পরিবার ও সমাজের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া যুবসমাজকে এই ধরনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

ব্র্যাকের জেলা সমন্বয়কারী মিতু রানী দেবনাথ, যারা কর্মশালার সভাপতিত্ব করেছেন, নিরাপদ অভিবাসন ও টেকসই পুনরেকত্রীকরণ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “অনিয়মিতভাবে বিদেশ যাওয়ার ফলে অনেকেই মানবপাচার, প্রতারণা এবং জীবনহানির শিকার হচ্ছে। পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব হলো যুবসমাজকে সচেতন করা। অভিবাসনের ঝুঁকি, বিশেষ করে মানবপাচারের বিষয়গুলো নিয়ে সবাইকে অবহিত করতে হবে।”

কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফাতেমা মাহজাবিন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা বেল্লাল হোসেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রবীন্দ্রনাথ দত্ত, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এবিএম সৌরভ রেজা শিহাব, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা পূর্ণিমা কবিরাজ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. শহিদুল ইসলাম এবং উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আশফিকুর রহমান। এছাড়া সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ ও বিদেশফেরত অভিবাসীরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

ইউরোপ থেকে সম্প্রতি ফিরে আসা অভিবাসীরা নিজের অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেন। মাল্টা-ফেরত অভিবাসী মাহাতাব মৃধা বলেন, “আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম বিদেশে নতুন জীবন শুরু করার। কিন্তু সবকিছু বাস্তব হয়নি। অনিয়মিতভাবে যাত্রা করায় আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে নিঃস্ব হয়ে ফিরেছি।” আরেক প্রবাসী আব্দুল হান্নান জানান, “প্রত্যাশা-২ প্রকল্পের সহায়তায় আমরা মনো-সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনরেকত্রীকরণ সেবা পেয়েছি। এই সহায়তা আমাদের নতুনভাবে জীবন শুরু করার প্রেরণা দিয়েছে।”

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ব্র্যাকের যৌথ অর্থায়নে ইম্প্রুভড সাসটেইনেবল রিইন্টিগ্রেশন অব বাংলাদেশি রিটার্নি মাইগ্রেন্টস (প্রত্যাশা-২) প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের লক্ষ্য হলো বিদেশফেরতদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, যাতে তারা স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দক্ষভাবে পুনঃএকত্রিত হতে পারে।

কর্মশালার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের রিজিয়নাল এমআরএসসি কো-অর্ডিনেটর দেবানন্দ মণ্ডল। তিনি বলেন, “যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তারা যেন তথ্যভিত্তিক এবং নিরাপদ পথে যাত্রা করে, তা নিশ্চিত করা আমাদের মূল লক্ষ্য। প্রতিটি পরিবার, শিক্ষক ও স্থানীয় নেতা এই সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।”

শিবচর উপজেলার উদাহরণ দিচ্ছে, যে কোনো সময়ে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি হলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রচুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ইউএনও এই ধরনের দূর্যোগ রোধে সকলকে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “যদি আমাদের মানুষ সচেতন হন, অনেক অকাল মৃত্যু এড়ানো সম্ভব। আমাদের সকলের দায়িত্ব হলো সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া।”

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ২০০৬ সাল থেকে দেশে বিশেষত অভিবাসনপ্রবণ জেলাগুলোর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। এটি শুধুমাত্র সচেতনতা তৈরি করেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিদেশগামীদের জন্য প্রশিক্ষণ, পুনরেকত্রীকরণ, অভিবাসন খাতে অ্যাডভোকেসি এবং অন্যান্য সহযোগিতামূলক কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করে। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক সারা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে পরিচিত। সংস্থাটি মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছে এবং বিশেষ করে যুবসমাজ ও নারী-পুরুষের জন্য নিরাপদ অভিবাসনের উপর গুরুত্ব আরোপ করছে।

কর্মশালার মাধ্যমে শিবচরের অভিবাসনপ্রবণ যুবসমাজকে মূল বার্তা দেওয়া হলো, যে বিদেশে যাত্রা সবসময়ই কঠিন, বিশেষ করে অনিয়মিত পথে। তারা যখন সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেবে, তখন মানবপাচার, প্রতারণা এবং জীবনহানির ঝুঁকি কমবে। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং পরিবারগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা না থাকলে যুবসমাজের এই ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

ইউএনও ইবনে মিজান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো যুবসমাজকে সঠিক পথে বিদেশ যাত্রার জন্য প্রস্তুত করা। গেম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচলিত ভুল তথ্যের কারণে কেউ যেন ঝুঁকিপূর্ণ পথে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপই হবে জীবন রক্ষার লক্ষ্যে।”

কর্মশালার শেষ পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তথ্যের পরিবেশন এবং নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। তারা সবাই মিলে একটি দায়িত্বশীল সম্প্রদায় গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন, যা ভবিষ্যতে বিদেশে নিরাপদ যাত্রার সংস্কৃতি প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শিবচর উপজেলা প্রশাসন এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মশালা প্রমাণ করে, যে কোনো নিরাপদ অভিবাসন কেবল সরকারের নীতি বা আইনের মাধ্যমে নয়, বরং সমাজ, পরিবার এবং এনজিওগুলো একযোগে কাজ করলে কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব। যুবসমাজের সঠিক শিক্ষা ও সচেতনতা তাদের জীবনকে রক্ষা করতে পারে এবং অনিয়মিত বিদেশ যাত্রার ঝুঁকি কমাতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত